বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাই এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব ও কার্যক্রম নিয়ে জনমনে আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামানকে ঘিরে কিছু অভিযোগ ও অপপ্রচার সামনে এসেছে। বাস্তব তথ্য ও বন্দরের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এসব অভিযোগের সঙ্গে বন্দরের চলমান উন্নয়নচিত্রের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর রিয়ার এডমিরাল মনিরুজ্জামান বন্দরের অপারেশনাল দক্ষতা বাড়ানো, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। এর ফল অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন সূচকে প্রতিফলিত হয়েছে।
তার দায়িত্ব গ্রহণের পর চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়। ২০২৪ সালে বন্দর প্রায় ৩.২৭৬ মিলিয়ন টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭.৪ শতাংশ বৃদ্ধি।
অপারেশনাল দক্ষতার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। আগে একটি জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করে পণ্য ওঠানামা শেষ করে বের হতে গড়ে প্রায় চার দিনের বেশি সময় লাগত। এখন সেই সময় কমে প্রায় ২.২৪ দিনে নেমে এসেছে, অর্থাৎ প্রায় ৪৫ শতাংশ উন্নতি হয়েছে।
বন্দরের আর্থিক অবস্থাও শক্তিশালী হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট আয় বেড়ে ৫২.২৮ বিলিয়ন টাকা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮.২২ শতাংশ বেশি। একই সময়ে উদ্বৃত্ত আয় দাঁড়িয়েছে ২৯.১৩ বিলিয়ন টাকা।
জাতীয় কোষাগারেও বন্দরের অবদান বেড়েছে। ওই অর্থবছরে সরকারকে ১৭.৬৫ বিলিয়ন টাকা প্রদান করা হয়েছে, যা বন্দরের ইতিহাসে অন্যতম বড় অবদান।
তার সময়েই চট্টগ্রাম বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়াতে একাধিক বড় অবকাঠামো প্রকল্প এগিয়েছে। ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বে টার্মিনাল প্রকল্প এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে এবং দেশকে আঞ্চলিক লজিস্টিক হাবে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করবে।
তার নেতৃত্বে বন্দর ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হয়েছে। Maritime Port Single Window, ই-গেট এবং অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার মতো উদ্যোগ বন্দরের কার্যক্রমকে আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ করেছে।
এদিকে তাকে ঘিরে যে অভিযোগগুলো সম্প্রতি উত্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর দুটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে আনা হয়েছে।
প্রথম অভিযোগটি বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে জাহাজ ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগ। কিন্তু তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট জাহাজ ক্রয়ের ঘটনা ঘটেছে তার বিএসসি ত্যাগ করার পর।
দ্বিতীয় অভিযোগটি কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিং সংক্রান্ত। এই ঘটনাটি ২০১৯ সালের, অথচ রিয়ার এডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন ২০২৪ সালে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উভয় অভিযোগের সঙ্গেই তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি। নৌবাহিনীতে দায়িত্ব পালনকালেও তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম বা সংশ্লিষ্টতার কোনো রেকর্ড নেই।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকের ধারণা, চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে তাকে অপসারণের পরিবেশ তৈরির উদ্দেশ্যেই এসব অভিযোগ উত্থাপন করা হতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। তাই এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নিয়ে যে কোনো আলোচনা বা সমালোচনা তথ্যভিত্তিক হওয়াই প্রয়োজন। বন্দরের বর্তমান পারফরম্যান্স ও উন্নয়ন কার্যক্রম বিবেচনায় নিলে স্পষ্ট হয়—রিয়ার এডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বন্দর নতুন গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।