ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসের গত প্রায় চার দশক যেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছায়ার মধ্যে কেটে গেছে। ১৯৮৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি কেবল দেশটির নেতা ছিলেন না, বরং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকের ভূমিকায় থাকেন, যিনি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, সশস্ত্র বাহিনী এবং বিচারব্যবস্থায় গভীর প্রভাব রেখেছেন। তার নীতি ও কার্যক্রম কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনে নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ও শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং সামাজিক সংস্কৃতিতে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলেছে।
খামেনির শাসনকে অনেকেই কঠোর ও লৌহকঠোর বলে অভিহিত করেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন তার প্রতিটি পদক্ষেপ সম্প্রচার করত, শহরের বিলবোর্ডে এবং দোকানপাটে তার ছবি সর্বত্র চোখে পড়ত। বিদেশে যখন ইরানের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী আলোচনায় থাকতেন, দেশের অভ্যন্তরে সব নিয়ন্ত্রণের দড়ি খামেনিই টানতেন। তার উপস্থিতি ছিল রাজনীতি, মিডিয়া এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সবক্ষেত্রেই।
শনিবার ভোরে (স্থানীয় সময়), ৮৬ বছর বয়সে, খামেনির মৃত্যু ইরান এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের জন্য নতুন এক অনিশ্চিত অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তার অনুপস্থিতি শুধু রাজনৈতিক ভারসাম্যই নয়, দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশকেও প্রভাবিত করবে।
শুরুর জীবন ও উত্থান
১৯৩৯ সালে ইরানের মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন খামেনি। তরুণ বয়স থেকেই তিনি রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে শাহের পতনের পর নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থায় তিনি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে আসেন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনির মৃত্যুর পর তাকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করা হয়।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তার হাতে ছিল সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের চূড়ান্ত ক্ষমতা। ফলে নির্বাচিত সরকারের ওপরে থেকেও তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় নির্ধারক ভূমিকা রাখতেন।
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ
খামেনির সময় ইরানে রাজনৈতিক কাঠামো আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হয়। বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (Islamic Revolutionary Guard Corps) রাষ্ট্রের ভেতরে শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করে। এই বাহিনী শুধু নিরাপত্তা নয়, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দেশের ভেতরে ভিন্নমত দমন, রাজনৈতিক বিরোধীদের গ্রেপ্তার এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল তার শাসনের উল্লেখযোগ্য দিক। ২০০৯ সালের নির্বাচনের পর বিক্ষোভ, ২০১৯ সালের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি আন্দোলন এবং ২০২২ সালে মাহশা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া প্রতিবাদ কঠোরভাবে দমন করা হয়। মাহশা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নারীদের অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে ওঠে।
পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক প্রভাব
খামেনির পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ছিল পশ্চিমা প্রভাবের বিরোধিতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনা। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বাড়াতে তিনি বিভিন্ন মিত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেন। লেবাননে হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনে হামাস এবং ইরাক ও ইয়েমেনের বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতি ইরানের সমর্থন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও তার শাসনামলে আন্তর্জাতিক উত্তেজনার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক আলোচনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি তার সময়জুড়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল।
দীর্ঘ শাসনের প্রভাব
প্রায় ৩৭ বছরের নেতৃত্বে খামেনি ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেন। তার সমর্থকদের মতে, তিনি বিদেশি চাপের মুখেও রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষা করেছেন। সমালোচকদের মতে, তার শাসনে রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
তার দীর্ঘ শাসন ইরানের সমাজে একদিকে স্থিতিশীলতা এনেছে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও জোরালো করেছে। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সামাজিক পরিবর্তনের চাপ দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে জটিল করে তুলেছে।
রাজনীতিতে আলী খামেনির প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে অনুভূত হবে। তিনি এমন একটি শাসনব্যবস্থা রেখে গেছেন যেখানে ধর্মীয় নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গভীরভাবে জড়িত। তার সময়ের সিদ্ধান্তগুলো শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকেও প্রভাবিত করেছে।
ভবিষ্যতে ইরানের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা যেদিকেই যাক না কেন, খামেনির যুগ দেশটির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। [সূত্র: ব্রিটিনি্নকা, আল-জাজিরা]