প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত, জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি সত্যিকার অর্থে জনপ্রতিনিধিত্বশীল জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের নির্মমতার শিকার অসংখ্য মানুষের কান্না এবং হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অবশেষে আজ থেকে পুনরায় যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি জবাবদিহিমূলক জাতীয় সংসদের।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের রাজনীতির এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে তিনি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছেন। তাঁর ভাষায়, আল্লাহর অশেষ রহমতে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন করে যাত্রা শুরু করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম পর্যন্ত গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সূচনালগ্নে তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানানো হচ্ছে।
আন্দোলন-সংগ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেসব মা তাদের সন্তান হারিয়েছেন, যেসব সন্তান প্রিয়জন হারিয়েছে, যেসব পরিবার স্বজন হারিয়েছে এবং যেসব আহত মানুষ স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছেন—তাদের ত্যাগ আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি।’
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্যাতনের শিকার মানুষের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গুম, খুন, হত্যা, নির্যাতন, নিপীড়ন, মিথ্যা মামলা কিংবা জীবন্ত মানুষের কবরস্থানতুল্য বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’—কোনো কিছু দিয়েই মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখা যায়নি। তাদের সাহসী ভূমিকায় দেশে আবারও গণতন্ত্র ফিরে এসেছে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই যাত্রালগ্নে দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী ছাত্র-জনতাকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে তিনি বলেন, দেশের সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই গণতন্ত্রকে প্রহসনে পরিণত করে জাতীয় সংসদকে হাস্যরসের খোরাকে পরিণত করা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, ‘সংসদীয় গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য খালেদা জিয়া জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করেছেন। তিনি কখনো স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আপস করেননি।’
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি বলেছিলেন—‘জনগণই যদি রাজনৈতিক দল হয়, তাহলে আমি সেই দলেরই আছি।’ অর্থাৎ ব্যক্তি বা দলের স্বার্থ নয়, জনগণের স্বার্থই সবচেয়ে বড়—এটাই বিএনপির রাজনীতি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি প্রথমবারের মতো বিএনপি থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি এবং সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছি। সংসদে দলের প্রতিনিধিত্ব করলেও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি পুরো দেশের প্রতিনিধিত্ব করছি।’
তিনি বলেন, দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সব মানুষের স্বার্থ রক্ষাই তাঁর রাজনীতির মূল লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিএনপির রাজনীতি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার রাজনীতি। প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করাই তাদের লক্ষ্য।
এই লক্ষ্য অর্জনে জনগণ ও জাতীয় সংসদের সব দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দল বা মত ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তাবেদারিমুক্ত, ফ্যাসিবাদমুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে কোনো মতভেদ থাকার কথা নয়।
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদকে জাতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু না করে পূর্ববর্তী সরকার একে অকার্যকর করে ফেলেছিল। নতুন সরকার সংসদকে যুক্তি, বিতর্ক ও জাতীয় সমস্যা সমাধানের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।
নতুন সংসদের সূচনালগ্নে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার উপস্থিত না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট জনরোষে সাবেক স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেউ কারাগারে, কেউ নিখোঁজ কিংবা কেউ পলাতক।’
সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী প্রথম অধিবেশনের সভাপতিত্ব করার জন্য প্রবীণ রাজনীতিবিদ খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এ ধরনের পরিস্থিতি নজিরবিহীন নয়। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সংসদের সদস্য মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের নাম প্রস্তাব করেছিলেন।