সূচনা ও কৃতজ্ঞতা
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্য শুরু করেন “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বলে। তিনি সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে সালাম জানান এবং বলেন যে বহু ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে। তিনি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন যে দেশের জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে আবারও একটি জবাবদিহিমূলক, কার্যকর এবং জনপ্রতিনিধিত্বমূলক জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হলো। তার ভাষায়, এই সংসদের মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার নতুন পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
গণতন্ত্রের সংগ্রাম ও শহীদদের স্মরণ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বহু মানুষ জীবন দিয়েছেন। তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক আন্দোলন পর্যন্ত দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বিশেষভাবে স্মরণ করেন সেইসব পরিবারকে, যারা এই আন্দোলন সংগ্রামে তাদের প্রিয়জন হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার মতে, এই আত্মত্যাগই দেশের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করেছে।
সর্বস্তরের মানুষের ভূমিকা
বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন যে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এই সংগ্রামে দেশের সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেছে। ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, শিল্পী, কবি-সাহিত্যিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ সাহসিকতার সঙ্গে অন্যায় ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, গুম, খুন, নির্যাতন, রাজনৈতিক হয়রানি কিংবা মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়েও মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে দমন করা যায়নি। সেই সাহসী ভূমিকার ফলেই দেশে আবার গণতন্ত্র ফিরে এসেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার অবদান
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তার মতে, পরবর্তী সময়ে সেই গণতন্ত্রকে বিকৃত করা হয়েছিল এবং জাতীয় সংসদকে কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বদলে একটি প্রহসনের জায়গায় পরিণত করা হয়েছিল। তিনি বলেন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে খালেদা জিয়া জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আপসহীন অবস্থানে ছিলেন এবং স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তাই সংসদের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে তাকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন
প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি বক্তব্য স্মরণ করেন, যেখানে তিনি বলেছিলেন- “জনগণই যদি রাজনৈতিক দল হয়, তাহলে আমি সেই দলেরই আছি।” এই উক্তির মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান যে ব্যক্তি বা দলের স্বার্থের চেয়ে জনগণের স্বার্থই সবচেয়ে বড়। তিনি বলেন, বিএনপির রাজনীতির মূল দর্শন হলো জনগণের কল্যাণ ও দেশের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের দায়িত্বের কথা
তিনি উল্লেখ করেন যে তিনি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু একটি দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন না; বরং দল-মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তার ভাষায়, তার রাজনীতি মূলত দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার রাজনীতি।
বিএনপির লক্ষ্য ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের ধারণা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির রাজনৈতিক লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তিনি বলেন, প্রতিটি পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করে তুলতে পারলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। তার মতে, পরিবারভিত্তিক স্বনির্ভরতা অর্জনের মাধ্যমেই একটি সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা যাবে।
সংসদে সহযোগিতা ও ঐক্যের আহ্বান
তিনি সংসদের সকল সদস্যের প্রতি আহ্বান জানান যে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, নিরাপদ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সকল দলের সংসদ সদস্যদের পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে সংসদে গঠনমূলক বিতর্ক, আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে জাতীয় সমস্যার সমাধান খোঁজা হবে।
জাতীয় সংসদের কার্যকর ভূমিকা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে সংসদকে কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে দেওয়া হয়নি এবং অনেক ক্ষেত্রে তা অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। তিনি বলেন, নতুন সংসদকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে যেখানে যুক্তি, আলোচনা ও গণতান্ত্রিক বিতর্কের মাধ্যমে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। তার মতে, জাতীয় সংসদই হওয়া উচিত জাতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু।
বিশেষ পরিস্থিতিতে সংসদের যাত্রা
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা ব্যতিক্রমী। সাধারণত নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে পূর্ববর্তী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার উপস্থিত থাকেন, কিন্তু এবার সেই পরিস্থিতি নেই। তার ভাষায়, পূর্ববর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডের ফলে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে সাবেক স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না- কেউ কারাগারে, কেউ নিখোঁজ কিংবা কেউ পলাতক। এই বিশেষ পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন সংসদের কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।
সভাপতিত্বের প্রস্তাব
এই পরিস্থিতিতে সংসদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও পাঁচবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম সভাপতিত্বের জন্য প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি ও সংবিধানের আলোকে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ঐতিহাসিক নজিরের উল্লেখ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এরকম নজির আগেও রয়েছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম সংসদের অধিবেশন শুরু করার সময় সংসদের সদস্য মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের সভাপতিত্বের প্রস্তাব করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক উদাহরণ উল্লেখ করে তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে সংসদীয় রীতিনীতির ধারাবাহিকতার মধ্যেই দেখান।
সমাপনী বক্তব্য
বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদের সকল সদস্যকে ধন্যবাদ জানান এবং সংসদের নতুন যাত্রার জন্য শুভকামনা প্রকাশ করেন। তিনি আশা করেন যে এই সংসদের মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। বক্তব্য শেষ করেন “আল্লাহ হাফেজ” এবং “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” বলে।