রোজা শুরু হলেই ইফতার ও সেহরির সময় রান্নাঘরে ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বাজারে হঠাৎ ভিড়, পণ্যের দাম ওঠানামা এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তা এড়াতে আগেভাগে পরিকল্পিত কেনাকাটা ও সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি বলে মনে করছেন পুষ্টিবিজ্ঞানী ও খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রয়োজন অনুযায়ী তালিকা তৈরি করে এক মাসের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কিনে বৈজ্ঞানিকভাবে সংরক্ষণ করলে পুষ্টিমান বজায় থাকে, অপচয় কমে এবং খাদ্যজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, চাল, আটা, ময়দা, সেমাই, লাচ্ছা, ওটস ও চিড়ার মতো শস্যজাতীয় খাবার শরীরের প্রধান শক্তির উৎস। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব খাদ্য কম আর্দ্রতা ও ঠান্ডা পরিবেশে বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করলে ছত্রাক ও পোকা জন্মানোর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। একইভাবে মসুর, মুগ, ছোলা, কাবলি ছোলা, সয়াবিন ও ডিমের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার শরীরের শক্তি ধরে রাখতে এবং পেশি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডালজাতীয় খাদ্য শুকনো পরিবেশে দীর্ঘদিন ভালো থাকে, আর ডিম ফ্রিজে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখলে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত নিরাপদ থাকে।
রান্নার মসলা যেমন হলুদ, জিরা, ধনে, মরিচ ও গরম মসলা শুধু খাবারের স্বাদই বাড়ায় না, এগুলোতে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে। তবে আলো, বাতাস ও আর্দ্রতার সংস্পর্শে এলে এসব মসলার কার্যকারিতা কমে যায়। তাই বিশেষজ্ঞরা মসলাগুলো বায়ুরোধী পাত্রে এবং শুষ্ক স্থানে সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়া ইফতারের জন্য জনপ্রিয় খাদ্য খেজুর, মুড়ি, চিড়া ও বেসন আগে থেকে কিনে রাখলে প্রয়োজনের সময় সহজে ব্যবহার করা যায়। খেজুরে থাকা প্রাকৃতিক গ্লুকোজ দ্রুত শক্তি জোগায় এবং দীর্ঘ সময় রোজার পর শরীরকে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
মাংস, মাছ ও সবজি দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য ডিপ ফ্রিজ একটি কার্যকর পদ্ধতি। বিজ্ঞানসম্মত তথ্য অনুযায়ী, মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করলে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা একবার ফ্রিজ থেকে বের করা খাবার পুনরায় ফ্রিজে না রাখার পরামর্শ দিয়েছেন, কারণ এতে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে এবং পুষ্টিমান কমে যেতে পারে। এজন্য খাবার ছোট ছোট ভাগে সংরক্ষণ এবং সংরক্ষণের তারিখ উল্লেখ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পুষ্টিবিদরা আরও জানান, বাদাম, কিশমিশ, মধু, লেবু ও ইসবগুলের মতো স্বাস্থ্যকর খাবার রোজায় শরীর সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। এসব খাবারে থাকা ভিটামিন, খনিজ ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট দীর্ঘ সময় শক্তি সরবরাহ করে এবং হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে রোজায় পানিশূন্যতা এড়াতে সেহরি ও ইফতারে পর্যাপ্ত পানি পান এবং ফল ও শরবত গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য মজুত করলে একদিকে যেমন অপচয়ের ঝুঁকি বাড়ে, অন্যদিকে বাজারে কৃত্রিম সংকটও তৈরি হতে পারে। তাই পরিকল্পিতভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যপণ্য কেনা, সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ এবং পুষ্টিকর খাবার নির্বাচন করলে পুরো রমজান মাসজুড়ে সুস্থ থাকা ও স্বস্তিতে ইবাদত পালন করা সম্ভব হবে।