দীর্ঘদিনের অপেক্ষা শেষে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত বিষয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা এগোনোর পর ৩ এপ্রিলের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সার্ভিস চার্জ, অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে জাপানি পক্ষ তাদের আর্থিক প্রস্তাব পুনর্বিন্যাস করেছে। এতে বাংলাদেশের পক্ষের আগের বেশ কয়েকটি উদ্বেগ অনেকটাই কমেছে এবং আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি তৈরি হয়েছে।
সোমবার ও মঙ্গলবার বেবিচক সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ধারাবাহিক কারিগরি বৈঠকে উভয় পক্ষ মূল্য কাঠামো ও পরিচালন ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করে। এসব বৈঠকের ফলাফলের ভিত্তিতে বিষয়টি এখন নীতিগত পর্যায় পেরিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা এবং প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করেছেন। তিনি জানান, আগামী ৩ এপ্রিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দ্বিতীয় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং সেখানে চুক্তির বিষয়টি নিষ্পত্তির সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওই বৈঠকে সরকারের একাধিক শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। আলোচনায় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ায় দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনাও জোরালো হয়েছে।
তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণকাজ ৯৯ শতাংশের বেশি শেষ হলেও পরিচালন ও ব্যবস্থাপনা চুক্তি নিয়ে জটিলতার কারণে এটি এতদিন চালু করা সম্ভব হয়নি। এ বিলম্বের কারণে বিমানবন্দরে যাত্রীচাপ, ফ্লাইট জট, স্লট সংকট এবং সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ আরও বেড়েছে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আলোচনায় ফিরে গিয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান বের করার নির্দেশ দেন। এরপর ১৩ মার্চ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিষয়টি নতুন গতি পায়। ওই বৈঠকে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জাপানি কনসোর্টিয়ামের কাছে সংশোধিত প্রস্তাব চায়।
জাপানি কনসোর্টিয়ামে রয়েছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো কর্পোরেশন, সোজিত্জ কর্পোরেশন এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট কর্পোরেশন। তারা ইতোমধ্যে সংশোধিত ও তুলনামূলক কম ব্যয়ের প্রস্তাব জমা দিয়েছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নতুন প্রস্তাবে নমনীয়তা বেড়েছে এবং উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য একটি সমঝোতার পথ তৈরি হয়েছে।
জাইকার অর্থায়নে প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই টার্মিনাল প্রায় ৫ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটার এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে। এটি বছরে অতিরিক্ত ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী এবং প্রায় ৯ লাখ টন কার্গো পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে নির্মিত হয়েছে।
বিমান খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হওয়া শুধু শাহজালালের ওপর চাপ কমাবে না, বরং বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিমান ও লজিস্টিকস হাবে পরিণত করার পথও খুলে দেবে।
৩ এপ্রিলের বৈঠকে সমঝোতা হলে আগামী সপ্তাহেই চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে। সবকিছু অনুকূলে থাকলে বহু প্রতীক্ষিত এই টার্মিনাল চালুর মাধ্যমে দেশের বিমান চলাচল ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।