ইসলামে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পবিত্র আমানত। বান্দার ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত গুরুদায়িত্ব। যে ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় পদে অধিষ্ঠিত, সে মূলত জনগণের খিদমত ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়োজিত একজন আমানতদার সেবক। তাই এ দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠা, সততা ও জবাবদিহি অপরিহার্য।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, হকদারদের হক তাদের কাছে পৌঁছে দিতে। তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে। আল্লাহ তোমাদের কত উত্তম উপদেশই না দিচ্ছেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)
বেশির ভাগ মুফাসসিরিনের কাছে এই আয়াত উসমান বিন তালহা (রা.)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বংশগতভাবেই পবিত্র কাবা শরিফের তত্ত্বাবধায়ক এবং তার চাবির রক্ষক ছিলেন। তিনি হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের পর রাসুল (সা.) কাবা শরিফে উপস্থিত হয়ে তাওয়াফ ইত্যাদি সেরে নিয়ে উসমান বিন তালহা (রা.)-কে ডেকে পাঠালেন। অতঃপর তাঁর হাতে কাবা শরিফের চাবি হস্তান্তর করে বললেন, এগুলো তোমার চাবি। আজকের দিন হলো অঙ্গীকার পূরণ ও পুণ্যের দিন। (ইবনে কাসির)
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বিশেষ কারণে আয়াত অবতীর্ণ হলেও তার নির্দেশ সাধারণ এবং এতে সাধারণ ব্যক্তি ও শাসকশ্রেণি উভয়কেই সম্বোধন করা হয়েছে। উভয়কে আমানতগুলো তাদের প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এতে প্রথমত, এমন আমানতও শামিল, যা কারো কাছে হেফাজতের জন্য রাখা হয়। এতে খিয়ানত না করে চাওয়ার সময় হেফাজতের সঙ্গে যেন তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, পদ ও দায়িত্ব যোগ্য লোকদেরই যেন দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় পদ, ক্ষমতা, সম্পদ—সবই আমানত। সুতরাং দায়িত্বে অবহেলা করা মানে আমানতের খিয়ানত করা। মুমিন কখনোই তার দায়িত্বে অবহেলা করতে পারে না। কেননা সে জানে, তাকে মহান আল্লাহর দরবারে তার দায়িত্বের ব্যাপারে হিসাব দিতে হবে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক এবং তোমরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞাসিত হবে। একজন শাসক সে তার অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের রক্ষক, সে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন স্ত্রী তার স্বামীর গৃহের রক্ষক, সে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন গোলাম তার মনিবের সম্পদের রক্ষক, সে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব সাবধান, তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক এবং তোমরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞাসিত হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৫১৮৮)
এ হাদিস রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রতম দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী পর্যন্ত সবার জন্য প্রযোজ্য। ইসলাম শিখিয়েছে, পদ-পদবি শুধু মর্যাদা নয়, বরং তা কঠিন দায়বদ্ধতাও বটে।
তাই মহান আল্লাহ দয়া করে কাউকে কোনো পদে অধিষ্ঠিত করলে তার উচিত এই আমানত রক্ষা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। মহান আল্লাহকে ভয় করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। কেননা মহান আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়দের দেওয়ার হুকুম দিচ্ছেন, আর তিনি নিষেধ করছেন অশ্লীলতা, অপকর্ম আর বিদ্রোহ থেকে। তিনি তোমাদের উপদেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো।’ (সুরা : নাহাল, আয়াত : ৯০)
আর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিষ্ঠা বজায় রাখা বা ন্যায়বিচার মানে হলো, গোত্র বা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। কোনো দুনিয়াবি স্বার্থ বা ক্ষোভ যাতে ন্যায় থেকে বিচ্যুত করতে না পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সঙ্গে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দণ্ডায়মান হও। কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ করো, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৮)
অতএব, প্রত্যেক মুসলমানের উচিত আল্লাহ তাদের কোনো দায়িত্ব দিলে, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় কোনো দায়িত্ব দিলে তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা। কেননা তা না হলে আল্লাহর দেওয়া এই রহমত বিপদের কারণ হতে পারে। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ তাআলা যাকে জনগণের দায়িত্ব দিয়েছেন, কিন্তু খেয়ানতকারীরূপে যদি তার মৃত্যু হয়, তবে আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৯)