চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে দীর্ঘদিনের অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে সরকার। সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সমন্বয়ে পরিচালিত সাম্প্রতিক বৃহৎ অভিযানে এলাকাটি কার্যত প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আসে, যা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে একটি “টার্নিং পয়েন্ট”।
গত ২ মার্চ পরিচালিত এই অভিযানে কয়েক হাজার সদস্য অংশ নেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, অভিযানের আগে দীর্ঘ সময় ধরে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, মানচিত্রভিত্তিক পরিকল্পনা এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি সমন্বিত কৌশল প্রস্তুত করা হয়। সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে টার্গেট নির্ধারণ করে ধাপে ধাপে অভিযান পরিচালিত হয়। ফলে বড় ধরনের সংঘর্ষ ছাড়াই পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোও এই অভিযানকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরেছে। Prothom Alo তাদের প্রতিবেদনে জঙ্গল সলিমপুরকে দীর্ঘদিনের “নিয়ন্ত্রণহীন এলাকা” হিসেবে উল্লেখ করে অভিযানের পর প্রশাসনিক উপস্থিতি জোরদারের বিষয়টি তুলে ধরে। The Daily Star বিশ্লেষণে অবৈধ প্লট–বাণিজ্য ও পাহাড় ধ্বংসকে সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং এই অভিযানকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার সূচনা হিসেবে বর্ণনা করে। bdnews24.com জানায়, অভিযানে বিভিন্ন স্থান থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার এবং একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। The Business Standard তাদের প্রতিবেদনে হাজার কোটি টাকার অবৈধ প্লট বাণিজ্য ও এর পেছনের প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের বিষয়টি তুলে ধরে।
জঙ্গল সলিমপুর প্রায় ৩,১০০ একর পাহাড়ঘেরা এলাকা, যেখানে নব্বইয়ের দশক থেকে অন্তত ৩৭–৪০টি পাহাড় কেটে গড়ে ওঠে অবৈধ বসতি। ধারণা করা হয়, প্রায় ২৬ হাজার প্লট তৈরি করে এসব জমি বিক্রি করা হয়েছে, যার আর্থিক পরিমাণ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এই বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে শক্তিশালী দখলদার গোষ্ঠী ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, যা দীর্ঘদিন প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
অভিযানের পর এলাকাটিতে পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে এবং নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও অব্যাহত রয়েছে, যাতে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পুনরায় সংগঠিত হতে না পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযান শুধু আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের উপস্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য ভূমি ব্যবস্থাপনা, অবৈধ প্লট যাচাই, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বসবাসকারীদের ধাপে ধাপে পুনর্বাসনের বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
সব মিলিয়ে, সেনা ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে জঙ্গল সলিমপুরে পরিচালিত এই অভিযানকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সফল নিরাপত্তা অভিযান হিসেবে দেখা হচ্ছে।