মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশঙ্কা করছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন ব্যাহত হলে দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এতে শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতেও চাপ বাড়বে।
পরিশোধিত জ্বালানি তেল এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আসায় এ ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির নির্ভরতা কম। ফলে আগামী জুন পর্যন্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে আপাতত কোনো সংকট দেখছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেল সরবরাহে ঝুঁকি দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ১৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে।
এর সঙ্গে আমদানি করা এলএনজি থেকে যুক্ত হচ্ছে আরো ৮০০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে মোট সরবরাহের বড় অংশই এখন আমদানিনির্ভর। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আনা প্রায় পুরো এলএনজি হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে।
২০১৮ সাল থেকে জিটুজি ভিত্তিতে কাতার থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ।
পরে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ওমান থেকেও আমদানি শুরু হয়। পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্র জানায়, বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করা হয়, যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ টনই আসে কাতার থেকে।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেছেন, চলতি মাসে অন্তত ৯টি এলএনজি কার্গো মহেশখালীতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে ১৫ থেকে ১৮ তারিখের মধ্যে ১-২টি কার্গো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় যেসব কার্গো ১৫ তারিখের মধ্যে আসার কথা, সেগুলো এরই মধ্যে প্রণালি অতিক্রম করেছে।
তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে কিছুটা জটিলতা তৈরি হতে পারে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আরো বলেন, চলতি মাসে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে সংঘাত দীর্ঘ হলে বিকল্প উৎস থেকে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে চাপ
এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে দেশজুড়ে শিল্প খাতে গ্যাস-সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর ফলে শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, আবাসিক এবং পরিবহনসহ প্রায় সব খাতেই বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, সিরামিক ও স্টিলসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পে কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে যদি এলএনজি আমদানি ব্যাহত হয়, তাহলে শিল্প-কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সব ক্ষেত্রেই গ্যাস সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
গার্মেন্টস ও সিরামিক খাতের একাধিক উদ্যোক্তা গতকাল জানান, গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে তারা কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছেন না। এখন যদি গ্যাসের সরবরাহ আরো কমে যায় তাহলে শিল্পের উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হবে। একইসঙ্গে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেও তারা জানান। শিল্পে গ্যাসের সংকট কাটাতে বিকল্প দেশগুলো থেকে এলএনজি আমদানির অনুরোধ জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। গ্রীষ্মকাল সামনে রেখে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে লোডশেডিং বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং শিল্প খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
এ বিষয়ে বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘এখন দিন দিন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, ফলে বাড়তি জ্বালানিরও প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব পড়বে। এখন গ্যাস থেকে আমরা ৫০০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করছি। বাকিটা কয়লা, তেল ও আমদানি থেকে আসছে।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত দুই সপ্তাহের বেশি দীর্ঘ হলে গ্যাস, এলপিজি, কয়লা ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এতে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নতুন চাপ পড়বে।
সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি আরো কয়েক দিন পর্যবেক্ষণ করব। এ ধরনের সংকট অতীতেও তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে।’ বাণিজ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং জ্বালানি নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে।’
জ্বালানি তেল সরবরাহ আপাতত স্বস্তিতে
এদিকে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে তাৎক্ষণিক সংকট দেখছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ২০ দিনের জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে। সমুদ্রপথে এবং খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে আরো ২০ থেকে ২৫ দিনের সরবরাহ। সরকার জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২৮ লাখ ২০ হাজার টন তেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে বড় অংশ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হবে। ফলে এ ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা নেই বলে জানিয়েছে বিপিসি।
বিপিসির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, জ্বালানি তেল আমদানির চুক্তিগুলো সাধারণত ছয় মাস মেয়াদি হয় এবং আগামী জুন পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে তেল আসবে, যে রুটে ইরান সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ার কথা নয়।
তিনি আরো জানান, দেশে সব ধরনের জ্বালানির মজুদ ২০ দিনের বেশি রয়েছে। কয়েকটি জাহাজ খালাসের অপেক্ষায় এবং আরো কিছু পথে রয়েছে। ফলে জ্বালানি তেল সরবরাহে তাৎক্ষণিক বিঘ্নের আশঙ্কা কম।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানিতে সংঘাত দীর্ঘ হলে প্রভাব পড়তে পারে। বিকল্প হিসেবে ফুজাইরাহ টার্মিনাল ব্যবহারের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ—এই তিনটি বড় ঝুঁকি সামনে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘আশা করছি শিগগিরই যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। সে ক্ষেত্রে জ্বালানি নিয়ে তেমন একটা সমস্যা হবে না বাংলাদেশের। এ ক্ষেত্রে এলএনজি সরবরাহে কিছুটা বিঘ্ন হতে পারে। তবে দুই সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত বন্ধ না হলে সব ধরনের জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকট হবে। পাশাপাশি ব্যয়ও বাড়বে।’