রক্ত হলো মানবদেহের একমাত্র প্রবহমান টিস্যু, যা আমাদের শিরা-উপশিরায় ছুটে চলা লাল রঙের এক মহাজাগতিক প্রাণরস। এই এক ফোঁটা লাল তরল কেবল কোনো রং নয়, এটি জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা এক বিস্ময়কর পাহাদার।
বাইরে থেকে রক্তকে কেবল একটি লাল তরল মনে হলেও অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে এটি এক বিশাল নগরী। রক্তের মূল উপাদান চারটি— প্লাজমা, লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা এবং অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেট।
প্লাজমা (রক্তরস): রক্তের প্রায় ৫৫% অংশই এই হলুদ রঙের তরল। এটি শরীরের বিভিন্ন কোষে পুষ্টি উপাদান, হরমোন ও প্রোটিন পৌঁছে দেয় এবং বর্জ্য পদার্থ বহন করে বের করে দেয়।
লোহিত রক্তকণিকা: এটি রক্তের সবচেয়ে বড় সৈন্যবাহিনী। এদের প্রধান কাজ হলো ফুসফুস থেকে অক্সিজেন নিয়ে শরীরের প্রতিটি কোষে পৌঁছে দেওয়া এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ফিরিয়ে আনা।
শ্বেত রক্তকণিকা: এরা হলো শরীরের নিজস্ব সেনাবাহিনী। কোনো জীবাণু বা ভাইরাস শরীরে হামলা চালালেই শ্বেত রক্তকণিকা যুদ্ধে নেমে পড়ে এবং রোগ প্রতিরোধ করে।
অণুচক্রিকা (প্লাটিলেট): কেটে গেলে বা আঘাত পেলে রক্ত জমাট বাঁধাতে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে এই কণিকাগুলো। এরা দ্রুত ক্ষতস্থানে জাল তৈরি করে রক্তক্ষরণ বন্ধ করে।
রক্তের উৎপত্তি ও গুরুত্ব
শরীরের ভেতরের এই লাল নদী কিন্তু হুট করে তৈরি হয় না। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হাড়ের ভেতরের লাল মজ্জা বা বোন ম্যারোতে অলক্ষ্যে রাত-দিন তৈরি হতে থাকে কোটি কোটি রক্তকণিকা। এই রক্ত ছাড়া শরীরের একটি কোষও বাঁচতে পারে না। কারণ, অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় জ্বালানি পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখা, সবকিছুই সামলায় রক্ত।
রক্তের প্রকারভেদ বা ব্লাড গ্রুপ
লোহিত রক্তকণিকার আবরণে থাকা বিশেষ কিছু ‘অ্যান্টিজেন’-এর ওপর ভিত্তি করে মানুষের রক্তকে মূলত চারটি প্রধান গ্রুপে ভাগ করা হয়— ‘এ’, ‘বি’, ‘এবি’ এবং ‘ও’। পাশাপাশি ‘রেসাস ফ্যাক্টর’ বা আরএইচ প্রোটিনের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি গ্রুপকে পজিটিভ (+) ও নেগেটিভ (-) শ্রেণিতে চিহ্নিত করা হয়।
ভুল গ্রুপের রক্ত দিলে শরীরে যা ঘটে
চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, ভুল গ্রুপের রক্ত দিলে শরীরে তৈরি হয় এক ভয়াল নাটকীয়তা। যদি ভুলবশত একজন ব্যক্তির শরীরে অন্য গ্রুপের রক্ত প্রবেশ করানো হয়, তবে শরীরের ভেতরে শুরু হয় এক নিঃশব্দ কিন্তু তীব্র লড়াই।
ঘটনাটি ঘটে ঠিক এভাবে— ধরা যাক, একজন ‘এ’ গ্রুপের মানুষের শরীরে ভুল করে ‘বি’ গ্রুপের রক্ত দেওয়া হলো। সঙ্গে সঙ্গে রোগীর শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম) সেই নতুন রক্তকে নিজের ভাবার বদলে এক ‘মারাত্মক শত্রু বা অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে। এরপর শুরু হয় রক্তের ভেতরের গৃহযুদ্ধ। গ্রহীতার রক্তের প্লাজমায় থাকা অ্যান্টিবডিগুলো নতুন লোহিত রক্তকণিকাকে চারপাশ থেকে আক্রমণ করে। বৈজ্ঞানিক ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘হিমোলাইসিস’। রক্তনালীর ভেতরেই নতুন লোহিত রক্তকণিকাগুলো ফেটে চুরমার হতে থাকে।
হাজার হাজার রক্তকণিকা একযোগে ভেঙে যাওয়ার ফলে রক্তের ভেতর বিষাক্ত পদার্থের সৃষ্টি হয়। ভাঙা কোষগুলো রক্তনালীতে দলা পাকিয়ে রক্তপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়, একে বলে ‘ক্লটিং’। রোগী তীব্র পিঠের ব্যথা, বুকে চাপ, প্রচণ্ড জ্বর, কাঁপুনি এবং শ্বাসকষ্টে ছটফট করতে থাকেন। রক্তচাপ মারাত্মকভাবে নেমে যায়।
সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে কিডনিতে। বিপুল পরিমাণ ফেটে যাওয়া লোহিত রক্তকণিকার বর্জ্য ছাঁকন করতে গিয়ে কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ে। সঠিক সময়ে জরুরি ব্যবস্থা ও চিকিৎসা না পেলে রক্তনালীর এই যুদ্ধ রোগীর প্রাণ কেড়ে নিতে মাত্র কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা সময় নেয়।
তাই রক্ত প্রদান কেবল একটি চিকিৎসা নয়, এটি জীবনের সমীকরণ। এক ফোঁটা ভুল রক্ত যেমন ডেকে আনতে পারে মৃত্যুর বিভীষিকা, তেমনি সঠিক গ্রুপের রক্ত বাঁচিয়ে দিতে পারে একটি অমূল্য প্রাণ।