বাংলাদেশে গোয়েন্দা কার্যক্রমের ইতিহাস স্বাধীনতার পরপরই শুরু হয়। ১৯৭২ সালে গঠিত ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইনটেলিজেন্স (এনএসআই) এবং পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইনটেলিজেন্স (ডিজিএফআই)—এই দুটি সংস্থা মূলত দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন, সীমান্ত সুরক্ষা ও কৌশলগত গোয়েন্দা সংগ্রহে নিয়োজিত।
এক সময় এরা সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে পরিচিত ছিল, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের কাজের পরিধি বেড়ে গেছে; এখন তারা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, সাইবার নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে (Ashraf, 2022; Hossain, 2017)।
তবে সত্য এই যে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিয়ে দেশের ভেতরে নানা সময় বিতর্ক উঠেছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, এরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু একাডেমিক গবেষণাগুলো এই অভিযোগের যথেষ্ট প্রমাণ খুঁজে পায়নি। টেইলর অ্যান্ড ফ্রান্সিস থেকে প্রকাশিত Intelligence Oversight in South Asia গ্রন্থে গবেষক আসমা আশরাফ ও মোহাম্মদ সোহেল রানা (2023) দেখিয়েছেন, বাংলাদেশে ডিজিএফআই ও এনএসআই-এর সমালোচনার পেছনে রাজনৈতিক মেরুকরণই বেশি ভূমিকা রাখে, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নয়।
একইভাবে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০০৯ সালের রিপোর্টে কিছু অভিযোগ থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে—বিশেষ করে ২০২৩ সালের পর থেকে—জাতিসংঘ বা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কোনো যাচাইযোগ্য রিপোর্টে এসব সংস্থার বিরুদ্ধে নতুন কোনো গুরুতর অভিযোগ ওঠেনি। বরং, আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলোতে এই সংস্থাগুলোর “ট্রান্সপারেন্সি ও অ্যাকাউন্টেবিলিটি” বাড়ানোর পরামর্শই বেশি পাওয়া যায়, দমন বা বিলুপ্তির নয় (Alam et al., 2024)।
গত এক দশকে এই দুই সংস্থার ভূমিকা আন্তর্জাতিক পরিসরেও দৃশ্যমান হয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবিলা, সীমান্ত সন্ত্রাস দমন এবং সাইবার নিরাপত্তায় বাংলাদেশ যখন আঞ্চলিক সহযোগিতার অংশ হয়ে ওঠে, তখন ডিজিএফআই ও এনএসআই উভয়ই জাতিসংঘের সন্ত্রাসবিরোধী কমিটি (UN-CTC) ও ইন্টারপোলের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছে (Shaikh, 2024; Ahamed & Abid, 2025)।
একই সঙ্গে, গোয়েন্দা ব্যবস্থার অভ্যন্তরে কিছু ইতিবাচক সংস্কারও শুরু হয়েছে। গবেষক শ্যাফার ও আশরাফ (2025) উল্লেখ করেছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে গোয়েন্দা খাতে তিনটি প্রধান সংস্কারধারা লক্ষ্য করা যায়—
১️। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও বিশ্লেষণ ইউনিট স্থাপন,
২️। সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানে সমন্বয় বাড়ানো, এবং
৩️। পেশাগত প্রশিক্ষণ ও মানবাধিকার সচেতনতা বৃদ্ধি।
অন্যদিকে, সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এম. ডি. চৌধুরী (2023) দেখিয়েছেন যে, নির্বাচনী সময়ে গোয়েন্দা সংস্থার “প্রভাব” নিয়ে অভিযোগ থাকলেও প্রকৃতপক্ষে তারা নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করেছে। এতে তাদের কার্যক্রমকে “রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ” নয় বরং “সিকিউরিটি এনফোর্সমেন্ট” বলা অধিক যথাযথ।
বাংলাদেশে সামরিক ও বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বনাথন ও সাহু (2023)-এর গবেষণা বলছে, এখন ডিজিএফআই সরাসরি বেসামরিক নেতৃত্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হয়—যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন।
তবে একমতভাবে গবেষকরা বলছেন—সংস্থা ভেঙে ফেলা নয়, বরং সংস্কার, আধুনিকীকরণ ও পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। ড. অ্যালান ক্রয়েসান্ট ও সহগবেষকরা (Springer, 2013) সতর্ক করেছেন—“যে কোনো দেশে গোয়েন্দা বাহিনীকে দুর্বল করা মানে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে ঝুঁকিতে ফেলা।”
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই কথাটি একদম সত্য। কারণ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কেবল তথ্য সংগ্রাহক নয়; তারা রাষ্ট্রের অদৃশ্য ঢাল। তাই সমালোচনার মধ্যেও তাদের প্রতি আস্থা রাখাই যুক্তিযুক্ত—শর্ত হলো, তারা যেন সর্বদা সংবিধান, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রতি অনুগত থাকে।
পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে “ভাড়াটে বাহিনী” বলা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বরং একাডেমিক তথ্য অনুযায়ী, তারা এখন আন্তর্জাতিক মানের সহযোগী নেটওয়ার্কে কাজ করছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবুও, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও পেশাগত নৈতিকতা রক্ষায় সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে—এটি অস্বীকার করা যায় না।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কেবল অস্ত্রের উপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে বিশ্বাস, দক্ষতা ও দায়িত্ববোধের উপর। আর সেই বিশ্বাস পুনর্গঠনের কাজটি শুরু করতে হবে রাষ্ট্র ও নাগরিক—উভয়ের পক্ষ থেকেই।
বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা: বাস্তবতা, সমালোচনা ও সংস্কারের পথ
-ড. আব্দুল মজিদ মণ্ডল, অধ্যাপক ও কলামিস্ট
19
