ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক গুরুত্ব দিয়ে আবার পর্যালোচনা করা দরকার, যাতে বাইরের শক্তিগুলো এই অঞ্চলে প্রভাব কম ফেলতে পারে। রবিবার (১৫ মার্চ) সৌদি আরবে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আলিরেজা এনায়াতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ কথা বলেন।
যুদ্ধের ফলে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না, এ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন কি না জানতে চাইলে, রাষ্ট্রদূত আলিরেজা এনায়াতি বলেন, ‘এটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন এবং উত্তরটি সহজ হতে পারে। আমরা প্রতিবেশী এবং আমরা একে অপরকে ছাড়া চলতে পারি না। তাই আমাদের সম্পর্ক গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ দশকে এই অঞ্চল যা ঘটেছে , তা মূলত বহির্মুখী দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাইরের শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলাফল। এ কারণে অঞ্চলের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ এবং শক্ত করা দরকার।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো দুই হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার মুখোমুখি হয়েছে।
এর মধ্যে মার্কিন কূটনৈতিক মিশন এবং সামরিক ঘাঁটিসহ গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় তেল অবকাঠামো, বন্দর, বিমানবন্দর, হোটেল এবং আবাসিক এবং অফিস ভবনও রয়েছে।
২০২০ সালে ইরানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। সাম্প্রতিক হামলায় এই দেশটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে উপসাগরীয় সব আরব দেশই এর প্রভাব ভোগ করেছে এবং সবাই ইরানের নিন্দা জানিয়েছে।
বিশ্লেষক এবং আঞ্চলিক সূত্রগুলো বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিরাপত্তার গ্যারান্টার ছিল। কিন্তু দেশগুলোকে এমন একটি যুদ্ধে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সমর্থন দেশগুলো করে কিন্তু না চাইলেও চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুসারে, সৌদি আরবে পূর্ব অঞ্চলে আক্রমণ হচ্ছে। সেখানে রাজ্যের বেশিরভাগ তেল উৎপাদিত হয়।
এ ছাড়া রিয়াদের পূর্বদিকে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে আগে মার্কিন বাহিনী অবস্থান করেছিল এবং সৌদি রাজধানীর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত কূটনৈতিক কোয়ার্টারও রয়েছে।
সৌদি আরব এবং ইরান বছরের পর বছর ধরে শত্রুতার পরে ২০২৩ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে যার ফলে তারা অঞ্চলজুড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠীগুলিকে পিছনে ফেলেছিল। বছরের পর বছর শত্রুতার পর ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরান আবার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তারা যে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করত, সেই উত্তেজনাও কিছুটা কমে আসে।
সৌদি তেল খাতে হামলার জন্য ইরান দায়ী নয়
সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোর ওপর হামলার সঙ্গে ইরানের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন ইরানের কর্মকর্তা এনায়াতি। এর মধ্যে পূর্ব উপকূলে রাস তানুরা শোধনাগার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সীমান্তের কাছে মরুভূমিতে অবস্থিত শায়বা তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলার চেষ্টার ঘটনাও রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এই হামলার জন্য ইরান দায়ী নয়। যদি ইরান এসব হামলা চালাত, তাহলে তারা তা প্রকাশ করত।’ এমন মন্তব্য করলেও তবে হামলা আসলে করা করেছে তা তিনি বলেননি। এদিকে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতেও এসব পৃথক ঘটনার জন্য কাউকে দায়ী করা হয়নি। এনায়াতি দাবি করেন, ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু ও স্বার্থের ওপরই হামলা চালাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তিনি নিয়মিত সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। ধর্মীয় তীর্থযাত্রায় সৌদি আরবে আসা ইরানিদের ফিরে যাওয়া এবং অসুস্থদের চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সৌদি আরব সহযোগিতা করছে।
তিনি বলেন, তাদের স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথ ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না, সৌদি আরব তা প্রকাশ্যে জানিয়েছে। এ বিষয়ে তেহরান রিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তবে এই আলোচনা নিয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, এই যুদ্ধ ইরান ও পুরো অঞ্চলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার মতে, সংঘাত শেষ করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে তাদের হামলা বন্ধ করতে হবে এবং আঞ্চলিক দেশগুলোকে এই সংঘাতে জড়ানো যাবে না। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন এমন হামলা না হয়, সে জন্য আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা দরকার। তিনি বলেন, ‘শুধু তখনই আমরা একটি সমৃদ্ধ অঞ্চল গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে পারব।’