ইসলামী শরিয়তে মা-বাবার মর্যাদা, সম্মান ও সেবা-যত্নকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সন্তানের ওপর মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করা যেমন আবশ্যক, তেমনি প্রয়োজন হলে তাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করাও ইসলামী আইনে বাধ্যতামূলক।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মা-বাবার সঙ্গে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের বার্ধক্যে কোনো ধরনের কষ্ট দেওয়া, ধমক দেওয়া বা বিরক্তিসূচক কথা বলাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোরআনের ভাষায়, মা-বাবার সঙ্গে সম্মানজনকভাবে কথা বলতে বলা হয়েছে।
মা-বাবার ভরণ-পোষণের বিধান
ইসলামী ফিকহবিদরা একমত যে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে সন্তানের ওপর মা-বাবার ভরণ-পোষণ ওয়াজিব। কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াসের ভিত্তিতে এ বিধান প্রতিষ্ঠিত।
পবিত্র কোরআনে ব্যয় করার ক্ষেত্রে মা-বাবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। হাদিসেও সন্তানের উপার্জনে মা-বাবার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, মানুষের উত্তম খাবার হলো নিজের উপার্জনের খাবার, আর সন্তানের আয়ও তার নিজের উপার্জনের মতো।
আরেক হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে নিজের সম্পদ ও সন্তানের কথা উল্লেখ করলে তিনি বলেন, “তুমি এবং তোমার সম্পদ তোমার পিতার।”
আল্লামা ইবনে মুনজির রহ. বলেন, যেসব মা-বাবার নিজস্ব উপার্জন ও সম্পদ নেই, তাদের ভরণ-পোষণ দেওয়া সন্তানের জন্য আবশ্যক, এ বিষয়ে আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে।
কন্যা সন্তানেরও দায়িত্ব আছে
সমাজে অনেক সময় ধারণা করা হয়, মা-বাবার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব শুধু ছেলের ওপর। তবে ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এই ধারণা সঠিক নয়। চার মাজহাবের সম্মিলিত মত হলো, পুত্র সন্তানের মতো কন্যা সন্তানের ওপরও মা-বাবার দায়িত্ব বর্তায়।
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, কন্যারা পুত্র সন্তানের মতোই দায়িত্ব বহন করবে। তবে হাম্বলি মাজহাবে বলা হয়েছে, পুত্র ও কন্যা মিরাসের অনুপাতে দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
কখন সন্তানের ওপর ভরণ-পোষণ ওয়াজিব হয়
ইসলামী শরিয়তে মা-বাবার ভরণ-পোষণ সন্তানের ওপর ওয়াজিব হওয়ার জন্য প্রধানত দুটি শর্ত রয়েছে।
প্রথমত, সন্তান সামর্থ্যবান হতে হবে। অর্থাৎ সন্তানের নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর অতিরিক্ত সম্পদ বা আয় থাকতে হবে। এমন অবস্থায় মা-বাবা অভাবগ্রস্ত হলে তাদের ভরণ-পোষণ দেওয়া সন্তানের দায়িত্ব।
দ্বিতীয়ত, মা-বাবা অভাবগ্রস্ত হতে হবে। অর্থাৎ তাদের নিজস্ব সম্পদ বা নিয়মিত উপার্জন না থাকলে তারা সন্তানের কাছ থেকে ভরণ-পোষণ পাওয়ার অধিকারী হবেন।
ফকিহরা আরও একটি শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো ব্যয়কারী ব্যক্তি ব্যয়গ্রহণকারীর উত্তরাধিকারী হওয়া। যে ব্যক্তি উত্তরাধিকার লাভ করে, সাধারণত তার ওপরই ভরণ-পোষণের দায়িত্ব আসে।
মা-বাবা বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে
ফিকহবিদদের মতে, মা-বাবা বলতে মূলত জন্মদাতা পিতা ও গর্ভধারিণী মাতাকে বোঝানো হয়। একইভাবে অনেক আলেমের মতে বাবার সূত্রে দাদা-দাদি এবং মায়ের সূত্রে নানা-নানিও ভরণ-পোষণের অধিকারী হতে পারেন।
তবে মালেকি মাজহাবের মত হলো, সন্তানের কাছ থেকে সরাসরি ভরণ-পোষণ পাওয়ার অধিকার শুধু মা ও বাবার। দাদা-দাদি বা নানা-নানি এ বিধানের অন্তর্ভুক্ত নন।
সৎ মা বা সৎ বাবার ভরণ-পোষণ দেওয়া সন্তানের ওপর আবশ্যক নয়। তবে সামর্থ্য থাকলে এবং তারা অসহায় হলে আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে তাদের সহযোগিতা করা উত্তম ও প্রশংসনীয়।
ভরণ-পোষণের অন্তর্ভুক্ত বিষয়
ইসলামী আইনে ভরণ-পোষণ বলতে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণকে বোঝানো হয়। এর মধ্যে খাদ্য, পোশাক ও বাসস্থান প্রধান। মালেকি মাজহাবের দৃষ্টিতে, অপচয় ছাড়া ব্যক্তির মর্যাদা ও অভ্যাস অনুযায়ী জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় খরচও ভরণ-পোষণের অন্তর্ভুক্ত।
তবে মা-বাবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় সন্তানের ওপর চাপাতে পারবেন না। একইভাবে সন্তানও নিজের সামর্থ্য এবং মা-বাবার প্রয়োজন বিবেচনা করে দায়িত্ব পালন করবে।
চিকিৎসা, সেবক নিয়োগ ও ঋণ পরিশোধ
মা-বাবা অসুস্থ বা অক্ষম হলে তাদের চিকিৎসার খরচ দেওয়া সন্তানের দায়িত্ব। প্রয়োজন হলে তাদের সেবা-যত্নের জন্য সেবক বা সেবিকা নিয়োগ করাও আবশ্যক হতে পারে।
তবে মা-বাবার ঋণ পরিশোধ করা সন্তানের ওপর ওয়াজিব নয়। সন্তানের সামর্থ্য থাকলে ঋণ পরিশোধ করা উত্তম কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে।
স্ত্রী-সন্তান ও মা-বাবার মধ্যে অগ্রাধিকার
একজন ব্যক্তির ওপর নিজের স্ত্রী, সন্তান ও মা-বাবার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব থাকতে পারে। যদি সে সামর্থ্যবান হয়, তাহলে সবার প্রয়োজন পূরণ করা তার কর্তব্য।
কিন্তু সামর্থ্য সীমিত হলে প্রথমে নিজের প্রয়োজন, এরপর ছোট ও অক্ষম সন্তান, তারপর স্ত্রী এবং পরে অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের প্রয়োজন বিবেচনা করতে হবে। তবে আলেমরা বলেন, সন্তান অসচ্ছল হলেও অভাবী মা-বাবাকে নিজের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত করে নেওয়া উত্তম, কারণ পরিবারের সঙ্গে একজন বা দুজন মা-বাবাকে রাখা সাধারণত অসম্ভব নয়।
ইসলাম মা-বাবার সেবা-যত্নকে সন্তানের জন্য বড় নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী মা-বাবার ভরণ-পোষণ, চিকিৎসা, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রত্যেক সন্তানের কর্তব্য।
আল্লাহ তাআলা সবাইকে মা-বাবার যথাযথ সেবা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।