আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪৬তম জাতীয় সমাবেশে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (২০ মে) সকালে গাজীপুরের সফিপুরস্থ আনসার ও ভিডিপি একাডেমিতে প্রধানমন্ত্রী পৌঁছালে বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
অনুষ্ঠানের সূচনাতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সুসজ্জিত প্যারেড গ্রাউন্ডে ৪৬তম জাতীয় সমাবেশ উপলক্ষে আয়োজিত আকর্ষণীয় ও সুশৃঙ্খল কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন এবং অভিবাদন মঞ্চ থেকে রাষ্ট্রীয় সালাম গ্রহণ করেন।
এসময় বাহিনীর চৌকস দলগুলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ গার্ড অব অনার প্রদান করে।
সগৌরবে উদযাপিত হচ্ছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর জাতীয় সমাবেশ। একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য অবশ্যই এটি একটি গৌরবজনক উপলক্ষ। এই শুভলগ্নে আমি এই বাহিনীর সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা, সদস্য এবং তৃণমূলের অকুতোভয় আনসার-ভিডিপি সদস্য-সদস্যাদের প্রত্যেককে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ আনসার বাহিনীর গৌরবজনক ভূমিকা রয়েছে। প্রায় ৪০ হাজার রাইফেল নিয়ে আনসার সদস্যরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনীর ৬৭০ জন শহীদ হয়েছেন। বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির ৪৬তম জাতীয় সমাবেশ থেকে আমি তাঁদের অবদানকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি। আল্লাহর দরবারে তাঁদের মাগফিরাত কামনা করছি।
স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছিল। দেশে এক অস্থিতিশীল ও অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। এরই অংশ হিসেবে গ্রাম ও নগরপর্যায়ে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে গঠিত গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী-ভিডিপি এবং আনসার বাহিনীকে একীভূত করে এই বাহিনীর কাঠামো আরও শক্তিশালী, দক্ষ ও কার্যকর করা হয়েছিল। স্বাধীনতার ঘোষকের এই দূরদর্শী পদক্ষেপই আনসার ও ভিডিপিকে আজকের বহুমাত্রিক, জনসম্পৃক্ত ও গণপ্রতিরক্ষায় সক্ষম বাহিনীতে পরিণত করার ভিত্তি স্থাপন করেছে।
এরপর খালেদা জিয়া সরকারের সময় ১৯৯৫ সালে আনসার-ভিডিপি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এই বাহিনীকে স্বেচ্ছাসেবী কাঠামো থেকে একটি স্বতন্ত্র শৃঙ্খলা বাহিনীর মর্যাদা দেওয়া হয়, যা এই বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের ফলেই আজকের আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি গণমুখী প্রতিরক্ষা শক্তি এবং প্রান্তিক সক্ষমতার উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন পরিস্থিতিতেও আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের সকল থানা পাহারা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা সহায়তা প্রদানেও এই বাহিনী ভূমিকা রেখেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বের পাশাপাশি আনসার ও ভিডিপি সদস্যগণ সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও সক্রিয় অবদান রাখছেন।
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় আনসার-ভিডিপির যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক কর্মকর্তা ও সদস্যদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের আলোকে আপনাদের ‘ভিশন এবং সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা’—আমি মনে করি, এই বাহিনীর ভবিষ্যৎ কার্যক্রমকে আরও দক্ষ ও গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
যে কোনো দেশেই যে কোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য অনিবার্য ও অবশ্যপালনীয় নীতি হচ্ছে ‘চেইন অব কমান্ড’ এবং ‘ডিসিপ্লিন’ মেনে চলা। এই দুটি বিষয়ে সামান্যতম অবহেলা পরিলক্ষিত হলেও কোনো বাহিনী সুশৃঙ্খল বাহিনী হয়ে উঠতে পারে না। আপনাদের এ বিষয়টি গভীরভাবে মনে রাখা দরকার। কোনো বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলার অভাব পরিলক্ষিত হলে তাদের সম্পর্কে জনমনে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে আমাদের খেয়াল রাখা জরুরি।
আনসার ও ভিডিপির চারটি প্রধান স্তম্ভ—ব্যাটালিয়ন আনসার, অঙ্গীভূত আনসার, থানা বা উপজেলা আনসার এবং ভিডিপি-টিডিপি—এই প্রতিটি শক্তি সমন্বিতভাবে দেশের নিরাপত্তা ও তৃণমূলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। আমি মনে করি, এই কাঠামোই বাহিনীটিকে কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলভিত্তিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
বর্তমানে ৪৭টি আনসার ব্যাটালিয়নের মধ্যে ১৬টি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়োজিত। বাহিনীর ৫২ হাজার অঙ্গীভূত আনসার সদস্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সরকারি দপ্তর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। এই বাহিনীর ১৩ হাজারেরও বেশি হিল আনসার ও হিল ভিডিপি সদস্য বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা ও সম্প্রীতি জোরদারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি পুরুষ ও একটি মহিলা ভিডিপি প্লাটুন বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন মোকাবিলা ও মাদকবিরোধী কার্যক্রমসহ নানা সামাজিক উদ্যোগে সম্পৃক্ত থেকে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করছে। একইভাবে নগর এলাকায় টিডিপি সদস্যরা শহরে নিরাপত্তা জোরদারে কার্যকর ভূমিকা রাখছেন। ফলে বাহিনীটি কেবল নিরাপত্তা রক্ষা নয়, সামাজিক পরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আনসার-ভিডিপি নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও ভূমিকা পালন করছে, যা ইতিবাচক। ‘সঞ্জীবন প্রকল্প’-এর মাধ্যমে গ্রামভিত্তিক উদ্যোক্তা সৃষ্টি, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক এবং ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে জামানতবিহীন ঋণ সহায়তা প্রদান এবং কারিগরি ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
AVJOBS অর্থাৎ Ansar & VDP Job Portal সফটওয়্যার এবং AI application ব্যবহার করে দেশীয় ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগও সময়োপযোগী। একই সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রক্রিয়াধীন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নিয়ে আনসার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ সদস্যদের জন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বলেই আমার বিশ্বাস।
মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, 6G ওয়েল্ডিংসহ বহুমাত্রিক ও চাহিদাভিত্তিক আধুনিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। এসব উদ্যোগ সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার কৌশলগত লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একই সঙ্গে এ ধরনের দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সদস্যদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করছে এবং বাহিনীকে ক্রমান্বয়ে একটি কার্যকর Human Capital Development Platform-এ রূপান্তরিত করছে। আমি মনে করি, এ ধরনের উদ্যোগ ও কর্মতৎপরতা দেশে-বিদেশে আনসার ও ভিডিপির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আনসার-ভিডিপি বর্তমানে একটি নির্ভরযোগ্য “First Responder” স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী হিসেবে জনগণের আস্থা অর্জন করেছে। বন্যা, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগে এই বাহিনীর সাহসিকতা, দ্রুততা ও মানবিক দায়বদ্ধতা দৃষ্টান্তমূলক। একই সঙ্গে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং, সোলার প্যানেল এবং বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মতো পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এই বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যগণ টেকসই উন্নয়নের পথে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হচ্ছেন বলে আমি মনে করি।
ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আনসার-ভিডিপির সাফল্যও প্রশংসনীয়। ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম বাংলাদেশ গেমসে পরপর তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ২০০৪ সালে ‘স্বাধীনতা পদক’ অর্জন করে।
আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া আয়োজন সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করতে বর্তমান সরকার দেশের ১০টি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ৩৭৯ জন অঙ্গীভূত আনসার সদস্য মোতায়েনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
ক্রীড়াকে একটি পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বর্তমান সরকার যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। খেলাধুলার বিভিন্ন ইভেন্টে যেসব খেলোয়াড় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলছেন, একটি বেতন কাঠামোর আওতায় এনে বর্তমান সরকার তাঁদের স্পোর্টস কার্ড প্রদান করেছে। আপনারা নিঃসন্দেহে জেনেছেন, আনসার-ভিডিপির ১৫ জন ক্রীড়াবিদকেও বর্তমান সরকার স্পোর্টস কার্ড প্রদান করেছে।
আনসার ও ভিডিপি বাহিনীর কাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে ‘আনসার ব্যাটালিয়ন বিধিমালা, ২০২৬’, ‘ভিডিপি প্রবিধানমালা, ২০২৬’, ‘অঙ্গীভূত আনসার বিধিমালা, ২০২৬’ এবং ‘আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্য নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়নের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে এই বাহিনীর কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে ‘উপজেলা আনসার প্রবিধানমালা, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে বাহিনীর সদর দপ্তরে বায়োমেট্রিক উপস্থিতি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আপনাদের নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব এবং গভীর দেশপ্রেমের মাধ্যমে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ভবিষ্যতে “প্রযুক্তিনির্ভর মানবিক সামাজিক বাহিনী” হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।