ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত সম্মানজনক একটি পেশা ব্যাবসা-বাণিজ্য। কিন্তু কিছু মানুষের কারণে এই সম্মানজনক পেশা কলুষিত হয়। তারা জীবিকা অর্জনের এই উত্তম পেশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। নুন থেকে চুন খসলেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করা এক শ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ীর অভ্যাস। তারা কোনো অজুহাত পেলেই জনগণকে জিম্মি করে অধিক মুনাফা অর্জনে মরিয়া হয়ে ওঠে। মহানবী (সা.) এই প্রবণতাকে জঘন্য অপরাধ আখ্যা দিয়েছেন।
আদি ইবনে কাআব (রা.)- এর এক পুত্র মা-মার ইবনে আবু মা-মার (রা.) বলেন, রাসুলাল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জঘন্য অপরাধী ছাড়া কেউ-ই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি (মূল্য বৃদ্ধির আশায়) গুদামজাত করে না।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৩৪৪৭)
যারা ব্যাবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করার চেষ্টা করে, হালাল ভাবে উপার্জন করে, প্রতারণা করে না, মহানবী (সা.) তাদের রিজিকের বরকতের জন্য দোয়া করেছেন। আর যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, প্রিয়নবি (সা.) তাদের অভিশাপ দিয়েছেন। উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমদানি পণ্য সরবরাহকারী ব্যবসায়ী রিজিকপ্রাপ্ত হয় এবং মজুদদার অভিশপ্ত।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২১৫৩)
অর্থাৎ সৎ ব্যবসায়ী কোরআন-হাদিসের আইন মেনে সঠিক পথে ব্যাবসা করার কারণে সে কোনো গুনাহে লিপ্ত না হয়েই মুনাফা অর্জন করে। যা তার জন্য বরকতময়। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। এর বিপরীতে যে বেশি মুনাফার আশায় ইসলামী অনুশাসনের তোয়াক্কা না করে, মানুষকে জিম্মি করার জন্য মজুত করে, সে যতক্ষণ ওই কাজ থেকে ফিরে আসে না, ততক্ষণ গুনাহে লিপ্ত থাকে। কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়, তার এই উপার্জনে কোনো কল্যাণ কিংবা বরকত নেই। ফলে অঢেল সম্পদ তাকে সুখ দেয় না।
সে শারীরিক ও মানসিক শান্তি থেকে বঞ্চিত হয়। তার জীবনের আকাশ দুঃখ-দুর্দশা ও দুশ্চিন্তার কালো মেঘে অন্ধকার হয়ে যায়। উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, আমি রসুলুল্লাহ (সা.)- কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি মুসলমানদের বিরুদ্ধে (বা সমাজে) খাদ্যদ্রব্য মজুদদারি করে, আল্লাহ তাকে কুষ্ঠরোগ ও দারিদ্র্যের কষাঘাতে শাস্তি দেন।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২১৫৫)
এ জন্য প্রিয় নবিজি (সা.) ব্যবসায়ীদের সততা অবলম্বনের প্রতি বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন। কারণ মহান আল্লাহ সৎ ব্যবসায়ীদের যেমন জান্নাতে সম্মানজনক মর্যাদা দেবেন, তেমনি অসৎ ব্যবসায়ীদের জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ভোগ করাবেন। তাই ব্যবসায়ী সততা অর্জন করা প্রতিটি ব্যবসায়ীর জন্য আবশ্যক। রসুল (সা.) ব্যবসায়ীদের সর্বদা সততা অবলম্বনের প্রতি তাগিদ দিতেন। সৎ উপায়ে ব্যাবসার প্রতিদান ও অসৎ উপায়ে ব্যাবসার ক্ষতি সম্পর্কে উম্মতকে সতর্ক করতেন।
ইসমাঈল ইবনে উবাইদ ইবনে রিফাআ (রা.) থেকে পালাক্রমে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত, তিনি (রিফাআ) রসুলুল্লাহ (সা.)- এর সঙ্গে ঈদের মাঠে রওনা হন। রসুলুল্লাহ (সা.) লোকদের কেনা-বেচায় জড়িত দেখে বলেন, ‘হে ব্যবসায়ীরা,’ তারা রসুলুল্লাহ (সা.)- এর ডাকে সাড়া দিল এবং নিজেদের ঘাড় ও চোখ উঠিয়ে তাঁর দিকে তাকাল।
তিনি বলেন, ‘কেয়ামতের দিন ব্যবসায়ীদের ফাসিক বা গুনাহগাররূপে ওঠানো হবে; কিন্তু যে-সব ব্যবসায়ী আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে, নির্ভুলভাবে কাজ করে এবং সততা ধারণ করে, তারা এর ব্যতিক্রম।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১২১০)
অতএব, আমাদের ব্যবসায়ী সমাজের উচিত, আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় ব্যাবসার মাধ্যমে জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে জনগণকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা। বাস্তব সংকট দেখা দিলেও তার অজুহাতে কারসাজি করে জনদুর্ভোগ তৈরি না করা।
মহান আল্লাহ সবাইকে বোঝার ও আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।