অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর আদায়ের পক্ষে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
গ্রামীণ কল্যাণের করা দুটি রিটের রুল খারিজ করে বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
এর ফলে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা আদায়ের আইনি পথ তৈরি হয়েছে। তবে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর আপিল বিভাগে যাওয়ার কথা জানিয়েছে গ্রামীণ কল্যাণ।
প্রায় এক দশক আগে শুরু হওয়া এই আয়কর বিরোধে এর আগে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে রায় এসেছিল। পরে সেই রায় খারিজ, প্রত্যাহার এবং নতুন করে শুনানি—এভাবে কয়েক দফা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মামলাটি সর্বশেষ পর্যায়ে এসেছে।
বিরোধের শুরু কীভাবে
এনবিআরের দাবি অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে পরবর্তী পাঁচ অর্থবছরের আয়কর বাবদ গ্রামীণ কল্যাণের কাছে ৬৬৬ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।
এই দাবির বিরোধিতা করে ২০১৭ সালে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট করে গ্রামীণ কল্যাণ।
বিরোধের মূল বিষয়টি একটি আর্থিক চুক্তিকে ঘিরে।
২০০৪ সালে গ্রামীণ কল্যাণ তার তহবিলের একটি অংশ বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে চুক্তি করে। ওই চুক্তির আওতায় গ্রামীণ কল্যাণ প্রায় ৫৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা গ্রামীণ টেলিকমকে ঋণ দেয়।
পরবর্তী সময়ে ওই অর্থের বিপরীতে গ্রামীণ কল্যাণের তহবিলে যে অর্থ জমা হয়, এনবিআর সেটিকে আয়করযোগ্য আয় হিসেবে বিবেচনা করে।
তবে গ্রামীণ কল্যাণের বক্তব্য ছিল, গ্রামীণফোন থেকে লভ্যাংশ দেওয়ার সময়ই ১৫ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখা হয়েছিল। তাই একই অর্থের ওপর আবার কর আরোপ করা যায় কি না—সেটিই তাদের মূল প্রশ্ন।
এই বিষয়কে কেন্দ্র করেই এনবিআরের দাবির বিরুদ্ধে আদালতে যায় গ্রামীণ কল্যাণ।
২০২৩ সালে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে রায়
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্ট গ্রামীণ কল্যাণের করা রুল নিষ্পত্তি করে রায় দেন।
ওই রায়ে এনবিআরের কর কমিশনারের আদেশ বাতিল করা হয়েছিল।
পরে এই রায়ের বিরুদ্ধে এনবিআর আপিল আবেদন করলে বিষয়টি আবারও আদালতে যায়। পরবর্তী শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গ্রামীণ কল্যাণের দুটি রিটই খারিজ করে দেন হাইকোর্ট।
কিন্তু এরপর মামলায় আবার বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
রায় প্রত্যাহার কেন
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
এর কিছুদিন পর গ্রামীণ কল্যাণের রিট খারিজ করে দেওয়া আগের রায় প্রত্যাহার করে নেন হাইকোর্ট।
এর কারণ হিসেবে বলা হয়, আগের রায় দেওয়া বেঞ্চের একজন বিচারক একই মামলায় এর আগে সরকারপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন তখন জানিয়েছিলেন, একই মামলায় আগে সরকারপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ওই রায় ত্রুটিপূর্ণ হয়েছে বলে আদালত মনে করেছেন। এ কারণে রায় প্রত্যাহার করে মামলাটি নতুন বেঞ্চ নির্ধারণের জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়।
পরে প্রধান বিচারপতি মামলাটি বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে পাঠান।
সেই বেঞ্চে রুলের ওপর নতুন করে শুনানি শুরু হয়।
সর্বশেষ রায়ে কী বলা হয়েছে
দফায় দফায় শুনানি শেষে ১০ সেপ্টেম্বর গ্রামীণ কল্যাণের রিটের রুল খারিজ করে দেন হাইকোর্ট।
এর ফলে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর আদায়ের পথে আর হাইকোর্টে কোনো বাধা থাকল না।
রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুস সামাদ আজাদ বলেন, এখন যথাযথভাবে ডিমান্ড নোটিশ জারি করে সরকার রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে। সাধারণত এ ধরনের নোটিশে অর্থ পরিশোধের জন্য ৩০ দিন সময় দেওয়া হয়।
তবে গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পাওয়ার পর তাঁরা আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করবেন।
অর্থাৎ হাইকোর্টে এনবিআরের দাবির পক্ষে রায় হলেও, এই মামলার আইনি লড়াই এখানেই শেষ হচ্ছে না।
গ্রামীণ কল্যাণ কী ধরনের প্রতিষ্ঠান
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে প্রতিষ্ঠিত সাতটি প্রতিষ্ঠানের একটি গ্রামীণ কল্যাণ। ১৯৯৬ সালের ৬ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে গ্রামীণ কল্যাণ।
বর্তমানে সারা দেশে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১৫০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। শুরুতে মূলত গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যদের জন্য এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা হলেও এখন সাধারণ মানুষও সেবা নিতে পারেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি দরিদ্র ও প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা ও বৃত্তির ব্যবস্থাও করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।
ইউনূস এখন গ্রামীণ কল্যাণে নেই
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস একসময় গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান ছিলেন।
তবে ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আর প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত নেই বলে জানিয়েছেন গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুরুতে দাতাদের অর্থে গঠিত ‘সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট ফান্ড’-এর অর্থে কার্যক্রম পরিচালিত হলেও বর্তমানে নিজস্ব আয়েই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া গ্রামীণ টেলিকম থেকেও অর্থ পেয়ে থাকে গ্রামীণ কল্যাণ।
এখন সামনে কী
হাইকোর্টের সর্বশেষ রায়ের পর এনবিআর ৬৬৬ কোটি টাকা আদায়ের জন্য ডিমান্ড নোটিশ দিতে পারবে। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করতে হবে গ্রামীণ কল্যাণকে।
তবে প্রতিষ্ঠানটি আপিল বিভাগে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
ফলে প্রায় এক দশক ধরে চলা গ্রামীণ কল্যাণ ও এনবিআরের এই আয়কর বিরোধের নিষ্পত্তি শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগে গিয়ে গড়াতে পারে।
সূত্র: বিবিসি