পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাজধানীসহ সারা দেশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মহাসড়কের যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং যে কোনো দুর্ঘটনা মোকাবিলায় এবার সর্বোচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর নিরাপত্তা জোরদারে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) যৌথভাবে বিস্তৃত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ঈদের ছুটিতে সীমিত সংখ্যক পুলিশ সদস্যকে ছুটি দেওয়া হয়েছে—মেট্রোপলিটন এলাকায় প্রায় ২০ শতাংশ এবং জেলা পর্যায়ে ২৫ শতাংশ। ফলে ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ পুলিশ সদস্য মাঠে থেকে নিরাপত্তা দায়িত্ব পালন করছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। র্যাব জানিয়েছে, ঘরমুখো মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল এলাকাগুলোতে ৩২টি র্যাব টিম মোতায়েন করা হয়েছে। সদরঘাট, সায়েদাবাদ, শ্যামপুর, সূত্রাপুর ও কামরাঙ্গীরচরসহ বিভিন্ন এলাকায় তারা দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ ও গোয়েন্দা নজরদারির জন্য অতিরিক্ত ছয়টি সিভিল টিম কাজ করবে।
ঈদের সময় ফাঁকা ঢাকায় টহল বাড়ানো হবে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি করা হবে। এই কার্যক্রম ঈদের দিন ও পরবর্তী সময় পর্যন্ত চলবে।
যাত্রীদের সুবিধার্থে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে দুটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে র্যাব সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করবেন। অতিরিক্ত ভাড়া, টিকিট কালোবাজারি বা হয়রানির অভিযোগ সরাসরি জানানো যাবে এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে প্রধান জামাতকে ঘিরে ডিএমপি চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। ইউনিফর্ম ও সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হবে। মুসল্লিদের শুধু জায়নামাজ নিয়ে আসতে বলা হয়েছে; অন্য কোনো ব্যাগ বা সামগ্রী নিষিদ্ধ থাকবে। প্রবেশের আগে সবাইকে আর্চওয়ে গেট দিয়ে তল্লাশির মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
এবার ঈদযাত্রায় দ্রুত উদ্ধারকাজ নিশ্চিত করতে হেলিকপ্টার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সড়ক বা রেলপথে বড় দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে সশস্ত্র বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেলিকপ্টার প্রস্তুত থাকবে। মহাসড়কের ১৫৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি বসানো হয়েছে এবং প্রয়োজনে ড্রোন ব্যবহার করা হবে। টোল প্লাজাগুলোতে দ্রুত সেবা নিশ্চিত ও বিকল যান সরাতে অতিরিক্ত রেকার রাখা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, ঈদে প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়তে পারে, ফলে রাজধানী অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যাবে। এই পরিস্থিতিতে চুরি, ছিনতাই বা ডাকাতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই গলি-উপগলিতেও টহল বাড়ানো হচ্ছে। সন্দেহজনক চলাফেরা বা অস্বাভাবিক কিছু দেখলে নাগরিকদের ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করতে বা নিকটস্থ থানায় জানাতে বলা হয়েছে।
টিকিট কালোবাজারির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করা হয়েছে। টার্মিনালগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কঠোরভাবে দমন করা হবে।
এ দিকে সীমান্ত এলাকাতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, যাতে ঈদের সুযোগে মাদক ও চোরাচালান বৃদ্ধি না পায়। সম্প্রতি র্যাবের অভিযানে বিদেশি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিপুল মাদক জব্দ করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সও প্রস্তুত রয়েছে। নৌ দুর্ঘটনা মোকাবেলায় ডুবুরি দল, উদ্ধার নৌকা ও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় কোস্টগার্ডের টহল বাড়ানো হয়েছে এবং হাইওয়ের পাশে থাকা ট্রমা সেন্টার ও হাসপাতালগুলোকে জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।