দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখা এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলায় ১২ দফা সুপারিশ করেছে এ বিষয়ে গঠিত বিশেষ কমিটি। সুপারিশে জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুদ কমপক্ষে তিন মাসে উন্নীত করা, আমদানির উৎস বহুমুখী করা, সরবরাহ ব্যবস্থায় ডিজিটাল মনিটরিং জোরদার করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রবিবার জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতার কারণে দেশের জ্বালানি খাতে চাপ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণভাবে প্যানিক বায়িং, অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
কমিটি মনে করে, এ ধরনের সংকট মোকাবেলায় শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নয়, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা কাঠামোও শক্তিশালী করা জরুরি। এজন্য এলএনজি, সৌর, বায়ু, গ্যাস, কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানি উৎসের সমন্বিত ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং বা এসপিএম প্রকল্প এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট দ্রুত বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি রুফটপ সোলার স্থাপন বাধ্যতামূলক করা এবং সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়মিত তদারকির কথাও বলা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় সিস্টেম লস কমাতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে কমিটি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জ্বালানি পণ্য আমদানির সুযোগ তৈরি করা যায় কি না, তা যাচাইয়ের জন্য সমীক্ষা পরিচালনার সুপারিশ করা হয়েছে।
সংকটকালে অযৌক্তিক মজুদ ও প্যানিক বায়িং ঠেকাতে জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদারের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ কমিটি বলেছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি নীতি, অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল, বহুমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করা এখন সময়ের দাবি।
প্রতিবেদনে বিরোধী দলের ১০টি সুপারিশও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির প্রকৃত চাহিদা নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে সমীক্ষা, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, স্থলভাগ ও সমুদ্রভাগে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং অপরিশোধিত তেল অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা।
বিরোধী দলের সুপারিশে সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক সম্প্রসারণ, পার্বত্য অঞ্চলে মাইক্রো-হাইড্রোর সম্ভাব্যতা যাচাই, নদীপ্রবাহভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা অনুসন্ধান এবং সংকটকালে সরকারি যানবাহনের ব্যবহার কমানোর কথাও বলা হয়েছে।
এছাড়া হাইড্রোজেন ফুয়েল প্রযুক্তি, বায়োগ্যাস এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
কমিটির মতে, কোনো একক জ্বালানি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি খাতকে বহুমুখী, টেকসই ও ভবিষ্যৎ সংকট-সহনশীল করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।