শিল্প খাতের বিদ্যমান সংকট মোকাবেলা করে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল শনিবার (৪ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১১টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে ব্যবসায়ীরা জ্বালানিসংকট মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ, কর ও নীতিগত সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রস্তাব এবং শিল্প খাতের দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা সম্পর্কে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা জানান, প্রধানমন্ত্রী সরাসরি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শিল্প খাতের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার বিষয়ে জানতে পেরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের আশ্বস্ত্ত করেন, এখনো যে সমস্যাগুলো বিদ্যমান, তা পর্যায়ক্রমে সমাধান করা হবে। কিছু সমস্যা তাৎক্ষণিক সমাধানের নির্দেশনাও দেন প্রধানমন্ত্রী। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম এই বৈঠক ৪৫ মিনিট নির্ধারিত ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে ব্যবসায়ীদের সমস্যার কথা শোনেন।
ব্যবসায়ীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা চেয়েছেন
বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, ব্যবসায়ীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা চেয়েছেন। বিশেষভাবে সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরকারি সহায়তা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জোর দিয়ে বলেন, শিল্প উৎপাদন ও অর্থনীতির জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ই-ভিসা চালু ও বিমানবন্দরে ঝামেলামুক্ত প্রবেশের সুগম ব্যবস্থা করার প্রস্তাব উঠে আসে বৈঠকে।
আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে দ্রুততা আনতে গভীর সমুদ্রবন্দর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর তাগিদ দেন ব্যবসায়ীরা। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) কাছে বাজেট সহায়তা চাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
কর ও ঋণ নীতি সংস্কার
বৈঠকে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করা, ব্যাংকঋণের সুদহার কমানো এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কারে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীরা করের আওতা সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেন, তবে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার শর্তে।
মানবসম্পদ, কর্মসংস্থান ও টেকসই শিল্প উন্নয়ন
অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দেশের টেকসই কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বেসরকারি খাতকে বড় অংশীদার হিসেবে দেখতে চাইছেন।
তাই উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে জানতে চেয়েছেন কিভাবে মানসম্মত এবং টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়।’ তিনি আরো জানান, বৈঠকে দেশের উৎপাদন খাতের সম্ভাবনা, বিনিয়োগ, রপ্তানি ও সার্বিক শিল্প উন্নয়নের করণীয় নিয়ে মতামত বিনিময় করা হয়েছে। ফলোআপ বৈঠক আগামী ৯০ দিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে।
প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৈঠকে নীতি সংস্কার, প্রক্রিয়া সহজীকরণ, মানসম্মত নীতি বাস্তবায়ন, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন খাত উন্মোচন, মানসম্মত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের উপায়ও আলোচনায় উঠে এসেছে।
ক্রস-কাটিং ইস্যু ও নতুন প্রযুক্তি
বৈঠকে বিভিন্ন ক্রস-কাটিং ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে জ্বালানি, মানবসম্পদ, এনবিআর সংস্কার, লজিস্টিকস, রপ্তানি, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ, ব্র্যান্ডিং, নতুন প্রযুক্তি, বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং এবং অর্থায়নের বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন এসিআই পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. আরিফ দৌলা, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী, বে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউর রহমান, ইনসেপটা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মুকতাদির, ডিবিএল গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল জাব্বার, র্যাংগস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহানা রউফ চৌধুরী এবং প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর। এদিকে গতকাল রাতে বিডার পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল শনিবার বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আয়োজন করেন। এ আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল কয়েকজন ব্যাবসায়িক নেতার অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ শোনা এবং বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো চিহ্নিত করা। তবে লক্ষ করা গেছে, এ বিষয়ে কিছু বিভ্রান্তিমূলক তথ্য সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। স্পষ্ট করা যাচ্ছে, বৈঠকটি সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর কোনো আনুষ্ঠানিক উপদেষ্টা পরিষদ নয়, এটি কোনো সাংগঠনিক বা আইনি ভিত্তির পরিপ্রেক্ষিতে করা হয়নি। ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
বৈঠকে বাংলাদেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে আলোচনা হয় এবং বেসরকারি খাতের অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার বিষয়ে উদ্যোক্তাদের মতামত গ্রহণ করা হয়।