ভঙ্গুর সামষ্টিক স্থিতিশীলতা, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সংকট এবং সংকুচিত রাজস্ব সক্ষমতা নতুন সরকারের জন্য প্রধান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছে এসডিজি বাস্তবায়নে সিটিজেন প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ। সংস্থাটির মতে, টালমাটাল অবস্থা থেকে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পথে ফেরাতে হলে এসব কাঠামোগত সমস্যার দ্রুত ও সমন্বিত সমাধান জরুরি।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু : অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।
উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং সিটিজেন প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
অনুষ্ঠানে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, গত অন্তর্বর্তী সরকার যেসব ক্রয় ও বৈদেশিক চুক্তি করেছে, সেগুলোতে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় হয়েছে কি না তা পর্যালোচনা করা জরুরি। এসব চুক্তি শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা বন্দরকেন্দ্রিক নয়; বিভিন্ন ক্ষেত্রেই হয়েছে, যেগুলোর অনেক তথ্য এখনো পরিষ্কার নয়। তাই তিনি এসব বৈদেশিক চুক্তি পুনর্বিবেচনার আহবান জানান।
তিনি নতুন সরকারকে একটি উত্তরণকালীন দল গঠনের পরামর্শ দেন, যার প্রধান কাজ হবে আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ময়নাতদন্ত করে একটি ব্রিফিং ডকুমেন্ট তৈরি করা। তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে। একই সঙ্গে আগামী মার্চের শেষনাগাদ জাতীয় সংসদে একটি আর্থিক বিবৃতি উপস্থাপনের তাগিদ দেন তিনি। ২০০৯ সালের সরকারি আয়-ব্যয় ও বাজেট ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ অনুযায়ী এই বিবৃতি সরকারের আর্থিক স্বচ্ছতার বড় নিয়ামক হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাড়াহুড়া না করে চলতি অর্থবছরে সংযম দেখানো এবং পরবর্তী অর্থবছরের জন্য সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। এতে মূল্যস্ফীতি ও অন্যান্য সংকট মোকাবিলা সহজ হবে। তিনি নিত্যপণ্যের সরবরাহ-শৃঙ্খলে রাজনৈতিক প্রভাবাধীন সিন্ডিকেট ভাঙার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কার্যকর করারও দাবি জানান।
তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বৈশ্বিক পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাংলাদেশে তা এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে। জানুয়ারিতে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৭৭ শতাংশে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও অখাদ্য খাতে তেমন স্বস্তি আসেনি। পাশাপাশি মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয় ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, বিনিময় হার কিছুটা স্থিতিশীল হওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার কারণে পরিশোধ ভারসাম্যের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। তবে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা এবং উন্মুক্ত বাজার থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ—এই দুই কারণে অর্থ সরবরাহ বাড়ছে, যা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আরো বাড়াতে পারে।
বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতার ফলে কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে দেশে প্রায় ২১ লাখ চাকরি হারিয়েছে। শিল্প ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, আগামী দিনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে এই দুই খাতকে পুনরুজ্জীবিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজস্ব সক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়। তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ দিয়ে এখন আর পুনরাবৃত্ত ব্যয় মেটানো যাচ্ছে না। ঋণ পরিশোধের জন্য নতুন করে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। দুর্বল রাজস্ব আদায় এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাইরের ব্যয়ের চাপ সরকারের নীতিগত পরিসর সংকুচিত করছে। ২০২৫ ও ২০২৬ অর্থবছরে এডিপি ব্যয় ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এই প্রেক্ষাপটে চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ের জন্য কঠোর বাজেট সীমা নির্ধারণ এবং একটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পরিকল্পনা গ্রহণের সুপারিশ করেছে সিটিজেন প্ল্যাটফর্ম। একই সঙ্গে আগামী অর্থবছরের জন্য বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট কাঠামো প্রণয়ন, নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ সংস্কার রোডম্যাপ তৈরি এবং বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ফোরাম গঠনের তাগিদ দেওয়া হয়।
নতুন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে ধাপে ধাপে এগোনোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সব প্রতিশ্রুতি একসঙ্গে বাস্তবায়নের চেষ্টা করলে তা সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। এজন্য অগ্রাধিকারভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন।
প্রবন্ধে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির প্রসঙ্গও গুরুত্ব পায়। এতে বলা হয়, গ্রামীণ ৫০ লাখ পরিবারকে মাসে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা দিতে বছরে আনুমানিক ৯ হাজার ৬০০ কোটি থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে, যা জিডিপির প্রায় ০.১৫ থেকে ০.২০ শতাংশের সমান। এ উদ্যোগ সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে সম্প্রসারণে সহায়ক হলেও বড় চ্যালেঞ্জ হবে উপকারভোগী নির্বাচন। এ জন্য প্রচলিত প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক পদ্ধতির পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ পদ্ধতি অনুসরণের সুপারিশ করা হয়।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করা জরুরি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার পর ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম শুরু করলে প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্ত করা সহজ হবে এবং দুর্নীতির ঝুঁকিও কমবে।
প্রবন্ধে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যের কথাও উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৪৬২ বিলিয়ন ডলার। এই লক্ষ্য অর্জনে ডলার ভিত্তিতে গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোও এই লক্ষ্য পূরণের শর্ত। ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৬.৮ শতাংশ। সংস্কারভিত্তিক পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী কয়েক বছরে এই অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব বলে ধারণা দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে সিপিডির তৌফিক ইসলাম বলেন, বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হলে এবং একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চাইলে, এমন উচ্চ রাজস্ব প্রবৃদ্ধিও যথেষ্ট না-ও হতে পারে। ফলে লক্ষ্য অর্জন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কার্যকর সংস্কার ও শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপরই নির্ভর করতে হবে।