অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে এ-সংক্রান্ত সংসদীয় বিশেষ কমিটি। এরই মধ্যে ১২০টির বেশি অধ্যাদেশ যাচাইবাছাই শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। গতকাল (২৫ মার্চ) সংসদ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে মঙ্গলবার কমিটির প্রথম বৈঠকে ৪০টি অধ্যাদেশ যাচাইবাছাই করা হয়। ২৯ মার্চ রাতে কমিটির তৃতীয় বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে।
কমিটির সদস্যরা জানান, ১৩৩টি অধ্যাদেশকে তিনটি ভাগে ভাগ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। প্রথমত কিছু অধ্যাদেশ যেভাবে আছে সেভাবেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিল আকারে এনে পাস করবে। দ্বিতীয়ত কিছু অধ্যাদেশে প্রয়োজনীয় সংশোধনীসহ বিল উত্থাপন করা হবে। আর তৃতীয়ত যেসব বিষয়ে একমত হওয়া যাবে না, সেগুলো এই অধিবেশনে ‘ল্যাপস’ (বাতিল) হয়ে যাবে; প্রয়োজনে পরবর্তী অধিবেশনে নতুন বিল হিসেবে আসবে।
গতকাল বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ পর্যালোচনার পর অধিকাংশ অধ্যাদেশ নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। কোনগুলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাখা হবে আর কোনগুলো বাতিল হবে, সে বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। সুনির্দিষ্ট তালিকাটি এখন চূড়ান্তভাবে ‘শর্ট-আউট’ করা হচ্ছে। আগামী ২ এপ্রিল রিপোর্টের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে। আইনমন্ত্রী বলেন, জুলাই সনদ আমাদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ দলিল। এর ৩ নম্বর পেজের ৬-এর ‘ক’ ধারা অনুযায়ী, সনদের ৮৪টি আর্টিকেলের মধ্যে ১ থেকে ৪৭ পর্যন্ত অংশ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য। যারা একে বাইপাস করে ভিন্ন কোনো আদেশ দিতে চায়, তারা সনদের পরিপন্থি কাজ করছে। আমরা সংবিধান ও জুলাই সনদকে প্রাধান্য দিয়েই সব পদক্ষেপ নিচ্ছি। তিনি বলেন, আমরা জুলাই সনদের বাইরে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নিইনি। জুলাই সনদ ও সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। জুলাই সনদ আমাদের কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং অত্যন্ত রেসপেকটেড জায়গা।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সংবিধান ও জুলাই সনদকে গুরুত্ব দিয়েছি। বিশেষ করে ‘জুলাই সুরক্ষা’ সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশের বিষয়ে সব সদস্য একমত হয়েছেন এবং এগুলো হুবহু সংসদে উপস্থাপন করা হবে। তিনি আরও বলেন, সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী নতুন বিল পাসের আগে পুরোনো অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে, যাতে আইনি জটিলতা তৈরি না হয়। অধ্যাদেশ পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এবং ‘সাংবিধানিকতা’ এই দুই বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা জুলাই জাতীয় সনদকে এখানে প্রাধান্য দিচ্ছি।
সাংবিধানিকতা রক্ষা এবং জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী প্রতিটি বিল বিবেচনা করা হচ্ছে। অধিকাংশ অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা শেষ হলেও দুদক আইন এবং মানবাধিকার কমিশন আইনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কমিটির সভাপতি ২৯ মার্চ রাত ৮টা ৩০ মিনিটে পরবর্তী সেশনের সময় নির্ধারণ করেছেন। আশা করি, ওই দিন মিটিংয়ে আমরা বাকি থাকা বিষয়গুলোর চূড়ান্ত ফয়সালা করতে পারব। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশই বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করা হবে বলে জানান অধ্যাদেশ যাচাইবাছাই-সংক্রান্ত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে সব সংসদ সদস্যের কাছে অধ্যাদেশের কপি পাঠানো হয়েছে। যাচাই করতে তেমন সময় লাগবে না। তাই দ্রুতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব বলে সরকার আশাবাদী। গতকাল দ্বিতীয় দিনের বৈঠক শুরুর আগে সংসদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা জানান।
গণভোট অস্বীকার করলে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাই থাকে না : কমিটির সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, গণভোট বিল রহিত করার যে প্রস্তাব সরকার এনেছে, আমরা তার তীব্র বিরোধিতা করেছি। গণভোট অস্বীকার করলে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাই থাকে না। তিনি বলেন, দুদক চেয়ারম্যান নিয়োগে এত দিন একটি সিস্টেম বা সার্চ কমিটি ছিল। কিন্তু এখনকার প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে সেই সার্চ কমিটি বাদ দিয়ে সরকার যাকে ইচ্ছা তাকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা নিতে চাচ্ছে। একইভাবে পুলিশ কমিশনার এবং আইজিপি নিয়োগেও পেশাদারত্বের চেয়ে সরকারের পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আমরা বলেছি, এটি জুলাই চেতনার পরিপন্থি এবং আমরা এতে একমত হইনি।
এরপরই আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেন। পরে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। কণ্ঠভোটে তা অনুমোদন পায়। সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপিত অধ্যাদেশগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাস না হলে সেগুলোর আইনি বৈধতা থাকে না। এ কারণেই এগুলো বিশেষ কমিটিতে পাঠিয়ে যাচাইবাছাই শেষে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।