বাগেরহাট জেলায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব-২০২৬ ঘিরে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। বিভিন্ন পূজামণ্ডপে চলছে পূজার প্রস্তুতি ও বর্ণাঢ্য আয়োজন। উৎসবকে শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। একইসঙ্গে জেলার ৬১১টি পূজামণ্ডপে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এ বছর বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন উপজেলায় মোট ৬১১টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিমার সংখ্যার দিক থেকে দক্ষিণাঞ্চলের বৃহৎ তিনটি দুর্গা মন্দিরের অবস্থানও এ জেলায়। ব্যতিক্রমী প্রতিমা, পৌরাণিক কাহিনিনির্ভর উপস্থাপনা ও নান্দনিক সাজ সজ্জায় এসব পূজামণ্ডপ ইতোমধ্যে বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে।
জেলার চিতলমারী উপজেলার চণ্ডীভিটা সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরে এবার তৈরি করা হয়েছে প্রায় তিন শতাধিক প্রতিমা। বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি ও ধর্মীয় উপাখ্যানের চরিত্র নিয়ে সাজানো হয়েছে মন্দির প্রাঙ্গণ। দেব-দেবীসহ নানা পৌরাণিক চরিত্রের প্রতিমা দেখতে বিপুল সংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম হবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা।
একই উপজেলার পঞ্চপল্লী সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরেও এবার প্রতিমার সংখ্যা ১৫০ ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে, বাগেরহাট সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী চুলকাটি বণিকপাড়া সার্বজনীন দুর্গামণ্ডপে ১৫১টি প্রতিমা নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ থিম পূজার। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিযুগের বিভিন্ন ধর্মীয় আখ্যান এবং দেব-দেবীর প্রতিমা দিয়ে সাজানো হয়েছে পূজামণ্ডপটি। ব্যতিক্রমী এই আয়োজন দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চুলকাটি বণিকপাড়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক কমল সাধু বাসস’কে বলেন, ‘প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও ১৫১টি প্রতিমা নিয়ে ব্যতিক্রমী থিম পূজার আয়োজন করা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ পূজামণ্ডপ হিসেবে পরিচিত এই আয়োজনে বিপুল সংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম হবে বলে আমরা আশা করছি।’
এদিকে, দুর্গোৎসবকে ঘিরে জেলার পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, টহল কার্যক্রম এবং দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করতে নেয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
বাগেরহাট জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার এটি এম আকরাম হোসেন তালিম বাসস’কে জানান অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে বাগেরহাট জেলাজুড়ে উৎসবের আমেজ বইছে।
বিএনপি’র নেতা-কর্মী নিজ নিজ এলাকায় সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উৎসবকে নির্বিঘ্ন করতে তারা মাঠে থাকবে। এ সংক্রান্তে ইতোমধ্যে জেলা বিএনপি’র বৈঠকে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। তিনি জানান, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জল দৃষ্টান্ত। সরকার এবং বিএনপি সবসময় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে এদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাসরত নারী পুরুষ সবচেয়ে বেশি নিরাপদ থাকে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বাসস’কে জানান, শারদীয় দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনের লক্ষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘শারদীয় দুর্গোৎসব শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও প্রতীক।’
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. জামিরুল ইসলাম বাসস’কে জানান, ভৌগোলিক অবস্থান ও অন্যান্য মানদণ্ড বিবেচনায় পূজামণ্ডপগুলোকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু পূজামণ্ডপে সার্বক্ষণিক পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি টহল দল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যাতে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে দুর্গোৎসব উদযাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পূজা উদযাপন কমিটি এবং সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় বাগেরহাটে শারদীয় দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ, আনন্দঘন ও সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশে উদযাপিত হবে। ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়বে সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে, সুদৃঢ় হবে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন।
বাগেরহাট জেলা শহরের নাগেরবাজার, পুরাতন চাউলপট্রি, রেলরোড়, দশানি, শালতলা মন্দিরে রাতের ব্যাপক আলোকসজ্জা, বিশাল নান্দনিক তোরণ দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এবারের আয়োজন যেন এক ব্যতিক্রমী পরিবেশ বিরাজ করছে বলে আমাদের বাসস প্রতিনিধি সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ উৎসাহ উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়।
আনুষ্ঠানিকভাবে পুজা উৎসবের আমেজ বইছে সমগ্র জেলাজুড়ে। উপকূলীয় অঞ্চল মোংলা, রামপাল, চিতলমারী, কচুয়াসহ ৯টি উপজেলা ও বাগেরহাট, মোংলা, মোরেলগঞ্জ ৩টি পৌরসভায় বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে হিন্দু সম্প্রদায় তাদের দুর্গোৎসবকে সবচেয়ে নির্বিঘ্ন মনে করছে।