দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। কয়েক দফা সময় পেছানোর পর আগামী ৭ এপ্রিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ফুয়েল লোডিংয়ের জন্য ইউনিট-১ এর সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এই ধাপটি সম্পন্ন হলে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টর চালু, পরীক্ষামূলক উৎপাদন এবং পরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পথ খুলে যাবে।
বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে রূপপুর প্রকল্পকে আরও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা এবং এলএনজি সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল স্থাপনা রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেলের ভেতরে ইউরেনিয়াম জ্বালানি সংযোজনের প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ফুয়েল লোডিং। রূপপুরের প্রথম ইউনিটে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করা হবে। এসব জ্বালানি আগেই রাশিয়া থেকে আনা হয়েছে এবং প্রকল্প এলাকায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এক বছরের প্রয়োজনীয় জ্বালানি ইতোমধ্যে মজুত রয়েছে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জ্বালানি লোডিংয়ের পর পরমাণু বিভাজন থেকে উৎপন্ন তাপ ব্যবহার করে টারবাইন ঘোরানো এবং ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি প্রস্তুত রয়েছে। প্রতিটি ধাপেই থাকবে কঠোর পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা যাচাই।
সাধারণত ফুয়েল লোডিং শেষ করতে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগে। এরপর খুব কম ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে, যা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে। পুরো প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আরও কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে। তবে পূর্ণ সক্ষমতায় ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগার সম্ভাবনা রয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ জানিয়েছে, রূপপুর থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রহণের জন্য জাতীয় গ্রিড প্রস্তুত। প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন নির্মাণও শেষ হয়েছে। যদিও গ্রিড ফ্রিকোয়েন্সি ও সিঙ্ক্রোনাইজেশন নিয়ে কিছু কারিগরি সতর্কতা রয়েছে, তবু সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী যে পরীক্ষামূলক উৎপাদন থেকে বাণিজ্যিক সরবরাহ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে সফলভাবে সম্পন্ন হবে।
রূপপুর প্রকল্পের নিরাপত্তা তদারকিতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএ নিয়মিত নজরদারি করছে। পাশাপাশি দেশে পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষও নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ইতিবাচক রয়েছে।
রাশিয়ার অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে পারে। আর দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে ভবিষ্যতে আরও ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।