কম সময়ে ফসল ঘরে তোলা যায়, বাজারে দামও পাওয়া যায় ভালো—এমন সম্ভাবনায় মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। শীতের শুরুতেই বাজারে আসে এই পেঁয়াজ। মাত্র দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ফসল তোলার উপযোগী হওয়ায় একই জমিতে পরবর্তী সময়ে অন্য ফসল চাষের সুযোগও থাকে। দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিবছর বাড়ছে এর আবাদ।রংপুরের পীরগঞ্জের কৃষক এনামুল হক এবার ৫০ শতক জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ করেছেন। তার মতে, শীতের শুরুতে বাজারে আসে বলে এ পেঁয়াজের ভালো দাম পাওয়া যায়।বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘অল্প সময়ে ফসলটা ঘরে আসে। আর লাভও পাই ভালো। সমস্যা হলো, কাঁচা অবস্থায় কাটা হয় বলে ১৫ দিনের মধ্যেই এটি বিক্রি করে দিতে হয়।’
এনামুল হক জানান, তার এলাকায় প্রায় ৯০ শতাংশ জমিতে এ সময় মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ করেন কৃষকরা।
আরেক কৃষক ইসমাইল হোসেন জানান, প্রতি আড়াই শতক জমিতে প্রায় পাঁচ মণ পর্যন্ত মুড়িকাটা পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। রোপণের ৪৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে পাতাসহ পেঁয়াজ বিক্রি করা যায়।
তিনি বলেন, রোপণের জন্য পাবনা কিংবা কুষ্টিয়া থেকে ছোট পেঁয়াজের গুটি সংগ্রহ করেন তারা। প্রতিটি গুটি থেকে চারটি পর্যন্ত পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়।
পীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমন আহমেদ জানান, এবার উপজেলায় প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ করেছেন কৃষকরা। অধিকাংশ জমিতে ইতোমধ্যে রোপণ শেষ হয়েছে। আগামী ৩৫ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে পাতাসহ এ পেঁয়াজ মাঠে দেখা যাবে।
তিনি বলেন, মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষে ছোট কিন্তু পূর্ণাঙ্গ পেঁয়াজের গুটি রোপণ করা হয়। অন্যদিকে বাজারে প্রচলিত সাধারণ পেঁয়াজের ক্ষেত্রে প্রথমে বীজ থেকে চারা তৈরি করে তা জমিতে রোপণ করতে হয়।
মুড়িকাটা পেঁয়াজ কী, যেভাবে চাষ হয়
পেঁয়াজ মসলাজাতীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল। বাংলাদেশে সাধারণত তিন পদ্ধতিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়—চারা রোপণ বা হালি পেঁয়াজ, পেঁয়াজের সেট বা গুটি রোপণ এবং সরাসরি বীজ বপন। পেঁয়াজের গুটি বা সেট রোপণ করে যে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়, সেটিই মুড়িকাটা পেঁয়াজ নামে পরিচিত।
ফরিদপুরের মসলা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আলাউদ্দিন খান জানান, প্রথমে পেঁয়াজের গুটি পাতাসহ সংগ্রহ করা হয়। এরপর গুটির গলা থেকে ওপরের অংশ কেটে জমিতে রোপণ করা হয়। পরে ওই গুটি থেকে নতুন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। এ পদ্ধতিতে উৎপাদিত পেঁয়াজই মুড়িকাটা পেঁয়াজ।
দেশের পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, রংপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় এ পেঁয়াজের চাষ হচ্ছে। প্রতিবছর এর আবাদ বাড়ছে। দেশে বছরে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন মুড়িকাটা পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়, যা মোট পেঁয়াজ উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক জানান, এবার জেলায় প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ হচ্ছে। এ পেঁয়াজ পাতাসহ তোলা হয় এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না।
কম সময়ে ফসল, একই জমিতে অন্য আবাদ
কৃষিবিদদের মতে, রোপণের প্রায় ৯০ দিনের মধ্যেই মুড়িকাটা পেঁয়াজ তোলার উপযোগী হয়। ফলে একই জমিতে পরে মরিচ, আলুসহ অন্যান্য ফসল চাষ করা যায়।
সাধারণত অক্টোবর ও নভেম্বর মাস মুড়িকাটা পেঁয়াজ রোপণের উপযুক্ত সময়। খানিকটা উঁচু বা মাঝারি উঁচু দোআঁশ মাটি এ চাষের জন্য ভালো। জমিতে পানি জমে থাকলে পেঁয়াজের গুটি রোপণ করা যায় না। রোপণের প্রায় তিন মাস পর গাছের পাতা উঁচু হয়ে কিছুটা ঝুঁকে পড়লে ফসল তোলার সময় হয়।
সাধারণত কৃষকরা পাতাসহ পেঁয়াজ তুলে বিক্রি করেন। তবে সংরক্ষণের জন্য শিকড়সহ গাছ তুলে মাথার অংশ কেটে রাখতে হয়। ফসল তোলার সময় পেঁয়াজের ভেতরের অংশ কিছুটা কাঁচা থাকে। এ কারণে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না এবং দ্রুত বিক্রি করতে হয়।
ড. আলাউদ্দিন খান জানান, সাধারণ পেঁয়াজের মূল আবাদ মৌসুম শুরু হয় ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে। সেই পেঁয়াজ বাজারে আসে মার্চ-এপ্রিলের দিকে। এর আগেই মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দাম বেশি, তবে রয়েছে ঝুঁকিও
শীতের শুরুতে বাজারে আসে বলে মুড়িকাটা পেঁয়াজের দাম তুলনামূলক বেশি থাকে। তবে এ সময়ে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হলে কৃষকদের লোকসানের ঝুঁকি তৈরি হয়। তা ছাড়া ফসলটি দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না বলে বাজারে দ্রুত বিক্রি করতে হয়।
কৃষকদের মতে, মুড়িকাটা পেঁয়াজের স্বাদ সাধারণ পেঁয়াজের চেয়ে ভালো। এ বিষয়ে ড. আলাউদ্দিন খান বলেন, স্বাদের দিক থেকে এ পেঁয়াজ প্রচলিত পেঁয়াজের মতোই। তবে কচি সবুজ পাতাসহ মুড়িকাটা পেঁয়াজেরও যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। এর কচি ফুল ও পাতা সবজি কিংবা সালাদের উপকরণ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা