অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামীকাল জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করবেন। এটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট এবং দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট হতে যাচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
এবারের বাজেটের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’। সরকারের লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসা পরিচালনায় জটিলতা কমানো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়া।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবারের বাজেটে অবকাঠামো খাতের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। মানবসম্পদ উন্নয়নকে সামনে রেখে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্পের বিকাশ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার পৃথক তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকতে পারে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও আসতে পারে বলে জানা গেছে।
স্বাস্থ্য খাতে নতুন উদ্যোগ হিসেবে ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ কয়েকটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত হতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোর বরাদ্দ বাড়ানোর কথাও ভাবা হচ্ছে।
যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রেখে সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকতে পারে। এছাড়া বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে এবারের বাজেটে বড় ধরনের সংস্কার উদ্যোগ থাকতে পারে। লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থাপনায় জটিলতা কমানোর পাশাপাশি ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যবসাসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রম আরও বেশি অনলাইনভিত্তিক করার প্রস্তাবও আসতে পারে। কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সহজ হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. মনজুর হোসেন বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই আগামী বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতি ঘিরে রাজস্ব সংগ্রহ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মতো চ্যালেঞ্জ থাকলেও নীতিনির্ধারকেরা আশা করছেন, চলমান সংস্কার কার্যক্রম দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনবে।