জুলাই বিপ্লবের এক বুকফাটা ট্র্যাজেডি আর নিষ্ঠুরতার সাক্ষী হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একদিকে জুলাই অভ্যুত্থানে স্বামীকে হারানোর তীব্র শোক, অন্যদিকে সেই হত্যার সাক্ষ্য দিতে আসার কারণে নিজের বড় মেয়েকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর তার আত্মহত্যার হৃদয়বিদারক ঘটনা। ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে এই নির্মমতা তুলে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন জুলাই শহীদ জসিম উদ্দিনের স্ত্রী।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সামনে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেয়ার সময় তিনি এই নির্মম নির্যাতনের বিবরণ দেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুরে নয়জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি সাক্ষ্য দেন।
ট্রাইব্যুনালকে ওই নারী জানান, স্বামীর হত্যার বিষয়ে তদন্তকারীদের কাছে জবানবন্দি দিতে গত বছরের ১৭ মার্চ তিনি তাঁর ভাই ও ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। তখন তাঁর বড় মেয়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থী হিসেবে পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার গ্রামের বাড়িতে ছিলেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরদিন ১৮ মার্চ বাবার কবর জিয়ারত করতে বাড়ি থেকে বের হন তাঁর মেয়ে। কবর জিয়ারত শেষে বাড়ি ফেরার পথে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা তাঁকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সাক্ষ্য দেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়ে ওই নারী বলেন, ‘আমি সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় এসেছিলাম, আর এ কারণে তারা আমার মেয়েকে ধর্ষণ করেছে।’
তিনি জানান, ধর্ষণের ঘটনা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর চরম সামাজিক অপমান ও মানসিক আঘাতের মধ্যে পড়েন তাঁর মেয়ে। একপর্যায়ে সেই মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন ওই কিশোরী।
গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান স্বামী
সাক্ষ্যে ওই নারী তাঁর স্বামীর মৃত্যুর ঘটনাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, তাঁর স্বামী একটি এনজিওতে গাড়িচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলন তীব্র হওয়ার সময় আগের দিনের সংঘর্ষে আহত হওয়ার পরও ১৯ জুলাই তিনি আবার আন্দোলনে যোগ দেন।
ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। রক্তাক্ত ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই নারীর ভাষ্য, গুলি তাঁর স্বামীর বুকে লাগে এবং এতে হাতের দুটি আঙুল উড়ে যায়।
সেদিন রাতেই তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে তাঁকে বনানীর একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৯ জুলাই তিনি মারা যান।
মরদেহ পেতেও ভোগান্তি
স্বামীর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করার ক্ষেত্রেও তাঁকে নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান ওই নারী।
তিনি বলেন, মরদেহ বুঝে নিতে তাঁকে বারবার বনানী ও মোহাম্মদপুর থানায় যেতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর দুই দিন পর, ৩১ জুলাই তিনি স্বামীর মরদেহ বুঝে পান। পরদিন সকালে গ্রামের বাড়িতে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
স্বামীর হত্যার বিচার ও ঘটনার তদন্তে সহযোগিতা করতেই তিনি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন। কিন্তু সাক্ষ্য দেওয়ার সঙ্গে তাঁর মেয়ের ওপর সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও পরবর্তী আত্মহত্যার যে মর্মান্তিক ঘটনা তিনি তুলে ধরেছেন, তা মামলার শুনানিতে নতুন করে গভীর বেদনার আবহ তৈরি করেছে।