বাংলাদেশকে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরে ভারতের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা-বয়ান নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, জঙ্গিবাদের আশঙ্কা কিংবা সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এসব বক্তব্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানের কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে—এ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স (GTI) ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদের প্রভাবে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে ভারত রয়েছে ১৩তম অবস্থানে। দেশটির স্কোর ৬.৪২৮। অন্যদিকে বাংলাদেশ রয়েছে ৪২তম অবস্থানে, স্কোর ২.২৮৬। অর্থাৎ সূচকে দুই দেশের মধ্যে ব্যবধান ২৯ ধাপ।
তবে এখানে GTI-এর প্রকৃতি বোঝা জরুরি। সূচকটি কোনো দেশকে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ হিসেবে চিহ্নিত করে না। বরং ১৬৩টি দেশে সন্ত্রাসবাদের সামগ্রিক প্রভাব মূল্যায়ন করে একটি যৌগিক স্কোর তৈরি করা হয়। এতে সন্ত্রাসী হামলা, প্রাণহানি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সূচকের প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের পরিস্থিতির উন্নতির তথ্যও রয়েছে
GTI ২০২৬-এর দক্ষিণ এশিয়া-সংক্রান্ত তথ্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশেই সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা কমেছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হামলার সংখ্যা কমেছে ১০০ শতাংশ, আর ভারতে কমেছে ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় মোট সন্ত্রাসী ঘটনার সংখ্যাও ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে।
এই পরিসংখ্যান সামনে রেখে প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সূচকের তথ্যগুলো কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?
কারণ রাজনৈতিক বক্তব্য এবং পরিসংখ্যান এক বিষয় নয়। কোনো দেশকে সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গিবাদের বড় ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরতে হলে সেই দাবির পেছনে সাম্প্রতিক তথ্য, নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা প্রতিবেদন, যাচাইযোগ্য ঘটনা ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।
একই মাপকাঠি কি সবার জন্য প্রযোজ্য?
বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ থাকতেই পারে। প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু উদ্বেগ প্রকাশ এবং রাজনৈতিক বয়ান তৈরির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সূচকে যখন ভারত ও বাংলাদেশের অবস্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, তখন শুধু বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা-ঝুঁকির বয়ান তৈরি করা হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে—একই মাপকাঠি কি দুই দেশের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে?
GTI-এর তথ্য অবশ্য কোনো দেশের রাজনৈতিক বক্তব্যকে সরাসরি ‘সত্য’ বা ‘মিথ্যা’ প্রমাণ করে না। সূচকটি সন্ত্রাসবাদের প্রভাব পরিমাপ করে। ফলে কোনো দেশের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিযোগ থাকলে তা আলাদাভাবে প্রমাণ ও যাচাই করতে হবে। একইভাবে, শুধু একটি সূচকের র্যাংকিং দেখেও কোনো দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
রাজনৈতিক বয়ান বনাম তথ্য
বাংলাদেশকে নিয়ে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ থাকলে তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশের দাবি উঠতেই পারে। একইভাবে, ভারতের পক্ষ থেকে যদি কোনো নির্দিষ্ট জঙ্গি নেটওয়ার্ক, সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকি কিংবা সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অভিযোগ করা হয়, সেক্ষেত্রে অভিযোগের ভিত্তি কী—সেটিও আলোচনায় আসা স্বাভাবিক।
কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে যাচাইযোগ্য তথ্যের গুরুত্ব বেশি। একটি অভিযোগ বারবার রাজনৈতিক বক্তব্যে পুনরাবৃত্তি করা আর সেই অভিযোগের পক্ষে নতুন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা এক বিষয় নয়।
GTI ২০২৬-এর তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং দেশটির সন্ত্রাসবাদের প্রভাবের স্কোরও আগের বছরের তুলনায় উন্নতি করেছে। ভারতও একই সময়ে উন্নতি করেছে, তবে সূচকে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের তুলনায় অনেক ওপরে।
তাই বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সূচকের তথ্যও আলোচনায় রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে প্রমাণ দিতে হবে, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে তথ্য দিতে হবে এবং সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তা হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে।