দেশের তৃণমূল পর্যায় ও আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা সুপ্ত মেধা ও বৈচিত্র্যময় প্রতিভাকে জাতীয় এবং বৈশ্বিক মঞ্চে তুলে ধরতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে শুরু হতে যাচ্ছে বিশেষ টিভি রিয়েলিটি শো ‘প্রতিভার সন্ধানে’।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রচলিত গান, নাচ কিংবা কমেডি-ভিত্তিক রিয়েলিটি শো-এর বাইরে গিয়ে সব ধরনের প্রতিভাকে একটি একক প্ল্যাটফর্মে সুযোগ দেওয়াই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। এতে ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প (যেমন- লাঠিখেলা, পুতুলনাচ, বহুরূপী), অ্যাক্রোবেটিক্স ও কসরত, জাদুবিদ্যা, রোবটিক্স, ড্রোন শো, স্যান্ড আর্ট কিংবা আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্ভাবনসহ যেকোনো ভিন্নধর্মী ও অসামান্য মেধা প্রদর্শনের সুযোগ থাকবে।
৪৫ থেকে ৬০ মিনিট ব্যাপ্তির মোট ৫২টি পর্বে গঠিত ১ বছর মেয়াদি এই রিয়েলিটি শো একই সাথে বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সম্প্রচারিত হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রতিযোগীদের ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন এবং ঘরে বসে অ্যাপ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আবেদনের মাধ্যমে অডিশন প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরপর দেশের ৮টি বিভাগে সরাসরি ‘বিভাগীয় অডিশন ক্যাম্প’ পরিচালনা করে মেধা যাচাই করা হবে। পরবর্তীতে স্টুডিও অডিশন, নকআউট রাউন্ড, সেমি-ফাইনাল এবং পাবলিক ভোটিং-এর সমন্বয়ে গ্র্যান্ড ফিনালের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয়ী নির্বাচন ও পুরস্কার প্রদান করা হবে।
দেশের সঙ্গীত, নৃত্য ও অভিনয় জগতের তিনজন কিংবদন্তি তারকাকে নিয়ে গঠিত হবে এই শো-এর মূল বিচারক প্যানেল। প্রতিযোগীদের নেপথ্যের গল্প ও ব্যাকস্টেজ তুলে ধরতে থাকবেন দু’জন জনপ্রিয় উপস্থাপক।
এই রিয়েলিটি শো’র মূল আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে, রেড বাটন- পরিবেশনা অপছন্দ হলে বিচারকদের পারফর্ম্যান্স থামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা; গোল্ডেন বাটন- অসাধারণ ও বিশ্বমানের পরিবেশনার ক্ষেত্রে সরাসরি দুই রাউন্ড পরবর্তী ধাপে উন্নীত করার এক্সক্লুসিভ সুযোগ; পাবলিক ভোটিং- চূড়ান্ত পর্যায়ে বিচারকদের মূল্যায়নের পাশাপাশি দর্শকদের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে বিজয়ী নির্ধারণ করা হবে।
‘ব্রিটেনস গট ট্যালেন্ট’- এর মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এই আয়োজনে বিশ্বমানের প্রিমিয়াম সেট ও লাইটিং ডিজাইন ব্যবহার করা হবে। প্রতিটি পরিবেশনার আগে থাকবে সিনেমাটিক ব্যাকস্টোরি, যা প্রতিযোগীদের সংগ্রামের গল্প তুলে ধরা হবে।
এই আয়োজনের মূলে থাকবে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (এফডিসি)। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান তানি বাসস’কে বলেন, এফডিসি দীর্ঘকাল ধরে দেশের সংস্কৃতি, শিল্প ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে বর্তমান পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেবল প্রথাগত শিল্পচর্চায় সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে থাকা বৈচিত্র্যময় ও সুপ্ত মেধাকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনা এখন সময়ের দাবি। সেই লক্ষ্য থেকেই তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় দিকনির্দেশনায় এফডিসি দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও সর্বজনীন আয়োজন ‘প্রতিভার সন্ধানে’ রিয়েলিটি শো-এর আয়োজক হিসেবে যুক্ত হতে যাচ্ছে।
এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরও বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট- গান, নাচ বা অভিনয় দক্ষতার পাশাপাশি দেশের লোকশিল্প, শারীরিক কসরত, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি কিংবা অসামান্য মেধা থাকা সত্ত্বেও যারা উপযুক্ত প্ল্যাটফর্মের অভাবে আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছেন, তাদের স্বপ্ন পূরণের সবচেয়ে বড় দুয়ার হয়ে উঠবে এই মঞ্চ।
এফডিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সুযোগ পেলে তৃণমূলের প্রতিটি অংশ থেকেই অনন্য সব বিশ্বমানের প্রতিভাবান শিল্পী ও উদ্ভাবক বেরিয়ে আসবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও আধুনিক প্রযোজনার মেলবন্ধনে আয়োজিত এই জাতীয় উদ্যোগ দেশের প্রান্তিক মেধাগুলোকে কেবল রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিই দেবে না, বরং তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী করতে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
এ উদ্যোগ সফল করতে তারা দেশবাসী ও গণমাধ্যমের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেছেন।
এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান তানি বলেন, আমাদের দেশের সূচনা থেকেই গ্রাম-বাংলা ও তৃণমূলের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে রয়েছে অগণিত অসাধারণ ও বৈচিত্র্যময় মেধা। সুযোগ ও উপযুক্ত প্ল্যাটফর্মের অভাবে এই প্রান্তিক প্রতিভারা প্রায়শই আলো ঝলমলে মঞ্চের বাইরেই থেকে যায়। তাদের এই সুপ্ত সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাতে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে দিতেই আমরা ‘প্রতিভার সন্ধানে’ রিয়েলিটি শো-এর আয়োজন করতে যাচ্ছি।
এ বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকার সবসময় তরুণদের মেধার যথার্থ মূল্যায়ন এবং তাদের জন্য বহুমুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টির রাজনীতিতে বিশ্বাসী। আমরা মেধাবীদের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছি- যেখানে নতুন প্রজন্মের মেধার সমাগম ঘটবে।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বমানের এই উদ্যোগ কেবল বিনোদন দেবে না, বরং তৃণমূলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মেধাকে পুনরুজ্জীবিত করবে এবং সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত মেধাবীদের সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে অনন্য ভূমিকা রাখবে। আমরা বিশ্বাস করি, এই জাতীয় প্রয়াস আগামী প্রজন্মকে নিজেদের আত্মবিশ্বাসী ও স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন উদ্দীপনা জোগাবে।’
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আশা করছে, সুযোগ ও প্রচারের অভাবে হারিয়ে যেতে বসা শিল্পীদের স্বাবলম্বী করা, ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং নতুন প্রজন্মকে নিজেদের সম্ভাবনা বিকাশে উদ্বুদ্ধ করতে ‘প্রতিভার সন্ধানে’ একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।