২৫ আগস্ট ২০১৭। রাখাইনের মাটিতে শুরু হওয়া ভয়াবহ নৃশংসতার পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করে আশ্রয় নেয়। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত ঠিক নয়টি বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু প্রত্যাবাসনের স্বপ্ন এখনও স্বপ্নই রয়ে গেছে। শুধু যাচাই-বাছাই চলছে, ফেরত যাওয়ার পথ এখনও অন্ধকার।
মিয়ানমার সম্প্রতি জানিয়েছে, বাংলাদেশের দেওয়া আট লাখ আটাশ হাজারের তালিকা থেকে চার লাখের বেশি জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিন লাখের বেশি জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। সংখ্যাটা বড় মনে হলেও বাস্তবতা হলো—কোনো সময়সীমা নেই। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরু হবে না বলেই নেপিডো স্পষ্ট করে দিয়েছে। যাচাই মানেই ফেরত পাঠানো নয়। এই পার্থক্যই আজকের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
আরও গভীর সমস্যা হলো পরিচয়ের প্রশ্ন। একদিকে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা বলছে, অন্যদিকে তাদের ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় অস্বীকার করে আবারও ‘বাঙালি’ শব্দটি সামনে আনছে। এটি নতুন নয়। দেশটির পুরোনো অবস্থানই এটি। কিন্তু প্রত্যাবাসন আলোচনার এমন সময়ে এই বয়ান পুনরাবৃত্তি প্রশ্ন তোলে—সত্যিকারের সদিচ্ছা আছে কি? নাগরিকত্ব ও মর্যাদার নিশ্চয়তা ছাড়া ফেরত যাওয়া মানে কী?
নয় বছর আগে রাখাইনের পুরোটাই ছিল মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। তখন প্রত্যাবাসনের সমীকরণ তুলনামূলক সহজ মনে হয়েছিল। এখন সেই বাস্তবতা বদলে গেছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। আরাকান আর্মি রাখাইনের বিস্তীর্ণ অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। মংডুসহ উত্তর রাখাইনের অনেক এলাকা এখন তাদের হাতে। নেপিডোর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ যেখানে নেই, সেখানে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা কে দেবে? প্রশাসন কে চালাবে? অধিকার কে নিশ্চিত করবে?
আরাকান আর্মির উত্থান রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন আশাও আনেনি। তাদের বিরুদ্ধেও নিপীড়ন, বাস্তুচ্যুতি ও জোরপূর্বক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। ফলে রোহিঙ্গাদের সামনে সহজ কোনো পক্ষ নেই। একদিকে নেপিডোর পুরোনো পরিচয়-রাজনীতি, অন্যদিকে রাখাইনের নতুন ক্ষমতার জটিলতা—এই দুইয়ের মাঝে আটকে আছে প্রত্যাবাসন।
বাংলাদেশের জন্যও চ্যালেঞ্জ বেড়েছে। এতদিন শুধু নেপিডোর সঙ্গে আলোচনা চলত। এখন রাখাইনের বাস্তব ক্ষমতাকে উপেক্ষা করা কঠিন। আন্তর্জাতিক চাপ ধরে রাখা, মানবিক সহায়তার অর্থ নিশ্চিত করা এবং নতুন করে রোহিঙ্গা প্রবেশের ঝুঁকি মোকাবিলা—সবই একসঙ্গে করতে হচ্ছে। দাতাদের ক্লান্তি বাড়ছে, শিবিরে খাদ্য-স্বাস্থ্য-শিক্ষার সংকট দেখা দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা চলছে ঠিকই। কিন্তু আইনি রায় আর মাঠের বাস্তবতা এক নয়। প্রত্যাবাসনের পুরোনো প্রশ্ন এখন আরও জটিল হয়ে উঠেছে—তারা কোথায় ফিরবেন? কার কাছে ফিরবেন? কী অধিকার নিয়ে ফিরবেন? আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কে দেবে?
নয় বছর পরও উত্তর নেই। শুধু যাচাই-বাছাই চলছে। ফেরত যাওয়ার দিন এখনও অনিশ্চিত।