নিজস্ব প্রতিবেদক
ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান বরাবরই বিশেষ। তিনদিকে ভারত, পূর্বে মিয়ানমার এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এই ভৌগোলিক বাস্তবতা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর না করে বহুমুখী অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের সামনে।
নিরাপত্তা সহযোগিতা, আঞ্চলিক যোগাযোগ, বন্দর ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক এই চারটি ক্ষেত্রে সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করতে পারলে বাংলাদেশ নিজের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এমন কিছু কূটনৈতিক কৌশল অনুসরণ করেছে, যেগুলো বাংলাদেশের জন্যও তুলনামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে।
সিঙ্গাপুরের ‘Little Red Dot Diplomacy’: ছোট দেশ, বড় কৌশল
সিঙ্গাপুরকে প্রায়ই ‘Little Red Dot’ নামে অভিহিত করা হয়। আয়তনে ছোট হলেও দেশটি তার ভৌগোলিক অবস্থান, বন্দর, বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংযোগকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই মডেলের কিছু শিক্ষা রয়েছে। বঙ্গোপসাগর, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থানকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ নিজেকে শুধু একটি বাজার নয়, বরং একটি আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও ট্রানজিট হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
চীন, ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্বার্থভিত্তিক সম্পর্কের মাধ্যমে ঢাকার কৌশলগত গুরুত্বও বাড়ানো সম্ভব।
তুরস্কের ‘Active Diplomacy’: একাধিক শক্তির সঙ্গে সক্রিয় সম্পর্ক
তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘Active Diplomacy’ বা সক্রিয় কূটনীতির ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া, মধ্য এশিয়া ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক বজায় রেখে তুরস্ক নিজের কৌশলগত প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।
বাংলাদেশও চাইলে একইভাবে নিজের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে পারে।
ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও বিনিয়োগ, তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সবগুলোকে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালনা করা হলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসর আরও বিস্তৃত হতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘Smart Power’: অর্থনীতি ও কূটনীতির সমন্বয়
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষেত্রে ‘Smart Power Diplomacy’ ধারণাটি প্রায়ই আলোচিত হয়। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, কূটনীতি এবং নিরাপত্তা সহযোগিতাকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে দেশটি আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের জন্যও অর্থনৈতিক সক্ষমতা কূটনীতির অন্যতম বড় হাতিয়ার হতে পারে।
দেশের বন্দর, শিল্পাঞ্চল, অবকাঠামো, জ্বালানি, লজিস্টিকস এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বও বাড়বে। অর্থাৎ অর্থনীতি যত শক্তিশালী হবে, আন্তর্জাতিক দরকষাকষির সক্ষমতাও তত বাড়বে।
ইন্দোনেশিয়ার ‘Bebas Aktif’: স্বাধীন সিদ্ধান্ত, সক্রিয় ভূমিকা
ইন্দোনেশিয়ার ‘Bebas Aktif’ বা ‘Free and Active Foreign Policy’ নীতির মূল ধারণা হলো কোনো নির্দিষ্ট শক্তির অধীন না থেকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কারও সঙ্গে স্থায়ী শত্রুতা নয়, আবার কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও নয় বরং জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা হতে পারে ঢাকার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
পশ্চিমে নিরাপত্তা, পূর্বে অর্থনৈতিক সংযোগ
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য পশ্চিম ও পূর্ব দুই দিকের সম্ভাব্য কৌশলগত সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে ঘিরে আলোচিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা বাড়লে নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে চীন ও মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বন্দর ও অবকাঠামোর গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে আঞ্চলিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত হতে পারে।
এতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ ও ট্রানজিটের গুরুত্ব যেমন থাকবে, তেমনি চীন-মিয়ানমার-বঙ্গোপসাগর নেটওয়ার্কেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
‘Buffer State’ নয়, ‘Bridge State’
বাংলাদেশের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু কোন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হবে এমন নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কীভাবে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের কৌশলগত মূল্য বাড়ানো যায়।
সিঙ্গাপুরের মতো ভৌগোলিক অবস্থানকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর, তুরস্কের মতো সক্রিয় কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো অর্থনীতি ও কূটনীতির সমন্বয় এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো স্বাধীন ও সক্রিয় পররাষ্ট্রনীতি—এই ধারণাগুলো বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োগ করা গেলে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হতে পারে।
তখন তিনদিকের ভৌগোলিক বাস্তবতা বাংলাদেশের দুর্বলতা না হয়ে শক্তিতে পরিণত হতে পারে। ভারত, চীন, মিয়ানমার, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে ভারসাম্যপূর্ণভাবে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ একটি ‘Bridge State’ বা সংযোগকারী রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।