প্রযুক্তির পরিবর্তনের গতি এখন অভাবনীয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, বায়োটেকনোলজি ও অটোমেশনের যুগে একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ক্রমেই নির্ভর করছে তার STEM—Science, Technology, Engineering and Mathematics শিক্ষার ওপর। চীন অনেক আগেই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে শিক্ষা ও শিল্পনীতির কেন্দ্রে STEM-কে স্থান দিয়েছে। প্রাথমিক স্তর থেকেই বিজ্ঞান, গণিত, কোডিং, রোবোটিকস ও হাতে-কলমে সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তারা একটি বড় প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ তৈরি করেছে।
চীনের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, STEM শিক্ষা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক হলে হবে না; শৈশব থেকেই বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও অনুসন্ধিৎসা তৈরি করতে হবে। দেশটির বিভিন্ন স্কুলে প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, বিজ্ঞান ক্লাব, কোডিং ও ব্যবহারিক বিজ্ঞানের চর্চা বাড়ানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্কুল ও শিক্ষার্থীদের সংযোগও তৈরি করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য বিজ্ঞান শেখে না; বাস্তব জীবনের সমস্যা চিহ্নিত করা, তথ্য বিশ্লেষণ, মডেল তৈরি এবং সমাধান প্রয়োগের দক্ষতাও অর্জন করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই পরিবর্তন আরও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাবিদদের মতে, AI যখন দ্রুত তথ্য সরবরাহ করতে পারে, তখন শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রশ্ন করতে শেখানো, তথ্যের সত্যতা যাচাই করা, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নতুন সমাধান উদ্ভাবন করা। অর্থাৎ ভবিষ্যতের শিক্ষার্থীকে শুধু জ্ঞানভাণ্ডার নয়, একজন সমস্যা সমাধানকারী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশ এখান থেকে সরাসরি কিছু উদ্যোগ নিতে পারে। সরকারি স্কুলগুলোতে পর্যায়ক্রমে কোডিং ও বিজ্ঞান ক্লাব, ব্যবহারিক বিজ্ঞান ল্যাব এবং প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা চালু করা যেতে পারে। শিক্ষকদের AI, রোবোটিকস ও ডিজিটাল শিক্ষাপদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণা সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে STEM Excellence Centre, যৌথ গবেষণা প্রকল্প ও শিক্ষক-গবেষক প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
ডিজিটাল বৈষম্য কমাতেও বড় উদ্যোগ প্রয়োজন। চীনের National Smart Education Platform-এর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্মার্ট শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে বাংলা ভাষায় মানসম্মত ডিজিটাল পাঠ, ভার্চুয়াল ল্যাব, AI-ভিত্তিক শেখার উপকরণ ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ থাকবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। এই জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে সস্তা শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতিতে উত্তরণ সম্ভব। চীনের অভিজ্ঞতা তাই বাংলাদেশের জন্য অনুকরণ নয়, বরং নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি STEM বিপ্লবের নীতিগত রূপরেখা হতে পারে।