গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর এক মাস পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো—সীমান্তে কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি। নতুন সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা এটিকে সরকারের একটি ইতিবাচক সাফল্য হিসেবে দেখছেন এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা বজায় রাখতে চান। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সাধারণ মানুষকে সীমান্ত এলাকায় সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও বিজিবি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিজিবি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে সীমান্তে কোনো গুলির ঘটনা বা হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। বাহিনীটি বর্তমানে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং সাধারণ মানুষও সীমান্তের কাছাকাছি না যাওয়ার বিষয়ে সচেতন হচ্ছে। অন্যদিকে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) গত এক মাসে গুলি চালায়নি। কেন এই সময় গুলির ঘটনা ঘটেনি, তা ভারত সরকারের পক্ষ থেকেই স্পষ্ট করা সম্ভব বলে মনে করছে বিজিবি। তবে বিএসএফ যদি সহযোগিতামূলক আচরণ বজায় রাখে, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভালো হবে বলেও তারা মনে করে।
এর আগে সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ বহুবার উঠেছে বিএসএফের বিরুদ্ধে। সরাসরি গুলি করে অনেক সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হলেও অতীতে তা মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সীমান্ত হত্যার আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি হলো কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি সীমান্তে কিশোরী ফেলানী হত্যাকাণ্ড, যা দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।
বিজিবি সূত্র আরও জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে তিন বাংলাদেশি নিহত হন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে চোরাচালানের চেষ্টা করছিলেন। তবে ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত আর কোনো গুলির ঘটনা ঘটেনি।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দিল্লিকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর গুলি চালানো যাবে না। কোনো সমস্যা থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রতিবেশী দেশের পক্ষ থেকে গুলি না চালানো অবশ্যই ইতিবাচক। তিনি বলেন, “নিরীহ মানুষ যেন সীমান্তে প্রাণ না হারায়, সে বিষয়ে আমরা বারবার জোর দিচ্ছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে কাজ করছে।”
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ, বিজিবি, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, ভারত সরকারও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
এদিকে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ওই বছরে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হন—যাদের মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন নির্যাতনের ফলে মারা যান। আগের বছরগুলোতে নিহতের সংখ্যা ছিল ২০২৪ সালে ৩০, ২০২৩ সালে ৩১, ২০২২ সালে ২৩ এবং ২০২১ সালে ১৮ জন।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে সিলেট সীমান্তে ভারতের নাগরিকদের, বিশেষ করে খাসি সম্প্রদায়ের সদস্যদের হাতে অন্তত ১২ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বছরে আরও ৩৮ জন বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ বা নির্যাতনের শিকার হন এবং ১৪ জনকে বিএসএফ অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে তাদের মধ্যে মাত্র চারজনকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
মানবাধিকারকর্মী নাসির উদ্দিন এলান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সীমান্ত হত্যার ঘটনা বেড়েছিল। তবে গত এক মাসে কোনো হত্যাকাণ্ড না ঘটায় পরিস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যাচ্ছে।