ভারতের ক্ষমতাসীন দল Bharatiya Janata Party (বিজেপি)-এর বিরুদ্ধে এবার নতুন অভিযোগ—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো এসব কনটেন্ট শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করছে না, বরং বাংলাদেশকে ঘিরে একটি নেতিবাচক ও ভয়ের চিত্র তৈরি করছে।
একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, আসামের মুখ্যমন্ত্রী Himanta Biswa Sarma দুইজন মুসলিম টুপি পরা ব্যক্তির দিকে গুলি করছেন। ভিডিওতে লেখা—“বিদেশিমুক্ত আসাম”।
পরে জানা যায়, পুরো দৃশ্যটি কৃত্রিমভাবে তৈরি।
এই ভিডিওতে যাদের একজন হিসেবে দেখানো হয়, তিনি বিরোধী নেতা Gaurav Gogoi।
অর্থাৎ, AI ব্যবহার করে শুধু একটি ভিজ্যুয়াল নয়, বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা তৈরি করা হয়েছে—যেখানে মুসলিম পরিচয় ও ‘বিদেশি’ পরিচয়কে এক করে দেখানো হচ্ছে।
গবেষণা সংস্থা Bellingcat-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ৪৯৯টি পোস্টের মধ্যে ১৯৪টি United Nations-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী ঘৃণামূলক বক্তব্যের মধ্যে পড়ে।
এর মধ্যে অন্তত ৩১টিতে AI দিয়ে তৈরি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
এই কনটেন্টগুলোর একটি বড় অংশ সরাসরি বাংলাদেশকে ঘিরে তৈরি।
বাংলাদেশি বা বাঙালি মুসলিমদের “অনুপ্রবেশকারী”, “বিদেশি”, এমনকি “হুমকি” হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
একাধিক ভিডিওতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে—
“অবৈধ অনুপ্রবেশ” চলতে থাকলে ভারত “বাংলাদেশ হয়ে যাবে”।
এই ধরনের বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়—
এটি একটি ভয় তৈরির কৌশল, যেখানে একটি প্রতিবেশী দেশকে সংকট বা বিপদের প্রতীক হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, ধর্মীয় পোশাক—যেমন টুপি, দাড়ি বা লুঙ্গি—ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে মুসলিম পরিচয়কে আলাদা করে দেখানোর জন্য।
এর মাধ্যমে খুব সহজেই “আমরা” বনাম “তারা”—এই বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের ভেতরেও এর প্রভাব পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়িয়ে দেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে,
এটি শুধু অনলাইন কনটেন্ট নয়—
এটি দুই দেশের মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরির একটি প্রক্রিয়া।
এছাড়া, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনাকেও এই প্রচারণায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
কিছু ক্ষেত্রে AI দিয়ে ছবি পরিবর্তন করে আবেগ তৈরি করা হয়েছে—যেমন চোখে অশ্রু যোগ করা, নাটকীয় দৃশ্য তৈরি করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
AI এখানে শুধু প্রযুক্তি নয়—
এটি একটি শক্তিশালী প্রভাবক, যা মানুষের আগে থেকেই থাকা ধারণাকে আরও গভীর করে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—
এই কনটেন্টগুলোর অনেকগুলোতেই কোনো সতর্কবার্তা নেই যে এগুলো AI দিয়ে তৈরি।
ফলে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে নির্বাচনের আগে AI ব্যবহার করে বিভাজনমূলক প্রচারণার প্রবণতা বাড়ছে।
তবে ভারতের ক্ষেত্রে এটি একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে—
যেখানে একটি প্রতিবেশী দেশ, বাংলাদেশ, সরাসরি এই প্রচারণার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন এখন একটাই—
প্রযুক্তির এই ব্যবহার কি শুধুই রাজনৈতিক কৌশল?
নাকি এটি ধীরে ধীরে আঞ্চলিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলছে?
উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—
ডিজিটাল যুগে,
ঘৃণার ভাষা এখন আগের চেয়ে দ্রুত, শক্তিশালী এবং আরও বিস্তৃত।