আল্লাহ মহানবী (সা.)-কে অনন্য সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী করেছিলেন। তিনি তাঁকে এমন অনেক মর্যাদা দান করেছিলেন যা পৃথিবীর অন্য কোনো নবী বা রাসুলকে দান করা হয়নি। নিম্নে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কয়েকটি বিশেষ মর্যাদার বর্ণনা দেওয়া হলো।
১. নবীর হাতকে আল্লাহর হাত ঘোষণা: ষষ্ঠ হিজরিতে মহানবী (সা.) সাহাবিদের নিয়ে ওমরাহর উদ্দেশ্যে বের হন। কিন্তু পথে মক্কার মুশরিকরা বাধা দেয়। নবীজি (সা.) নিজের প্রতিনিধি হিসেবে উসমান (রা.)-কে মক্কায় প্রেরণ করেন। তখন খবর ছড়িয়ে পড়ে উসমান (রা.)-কে শহীদ করা হয়েছে। সংবাদের প্রতিক্রিয়ায় সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ইসলামের মর্যাদা রক্ষায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে যুদ্ধের শপথ গ্রহণ করেন। কোরআনে এই শপথ গ্রহণকে আল্লাহর হাতে শপথ গ্রহণ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, যারা তোমার হাতে বাইআত গ্রগণ করে তারা তো আল্লাহরই হাতে বাইআত করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর।’ (সুরা ফাতহ, আয়াত : ১০)
২. শয়তানের আত্মসমর্পণ: প্রতিটি মানুষের অনুচর হিসেবে একজন ফেরেশতা ও একজন শয়তান নিযুক্ত আছে। কিন্তু আল্লাহ শয়তানকে মহানবী (সা.)-এর অনুগত করে দিয়েছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেকের সাথেই একটি শয়তান নির্ধারিত আছে। সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার সাথেও কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমার সাথেও। তবে তার মোকাবিলায় আল্লাহ আমাকে সাহায্য করেছেন। এখন আমি তার সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে নিরাপদ। এখন সে আমাকে কল্যাণকর বিষয় ছাড়া কখনো অন্য কিছুর নির্দেশ দেয় না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭০০১)
৩. নবুওয়াতের ধারাকে পূর্ণতা দানকারী: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মাধ্যমে আল্লাহ নবুয়াতের ধারাকে পূর্ণতা দান করেছেন। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলে আকরাম (সা.) বলেন, আমার উপমা ও নবীগণের উপমা সে লোকের উপমা তুল্য, যে একটি বাড়ি তৈরি করল এবং সে তা সম্পূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ করল, তবে একটি ইটের স্থান ছাড়া। লোকেরা তাতে ঢুকতে লাগল এবং তা দেখে আশ্চর্য হতে লাগল এবং বলাবলি করতে থাকল, যদি এই একটি ইটের স্থান খালি না থাকত (তবে কতই না উত্তম হত)! রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি হলাম সে ইটের স্থান। আমি আগমন করলাম এবং নবীগণের পরম্পরা শেষ করলাম।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৮৫৭)
৪. সুন্নাহকে কোরআনের সমমর্যাদা দান: মহান আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথা, কাজ ও মৌনসম্মতি তথা সুন্নাহকে কোরআনের সমমর্যাদা সম্পন্ন ঘোষণা করেছেন। কোরআনের মতো হাদিসের অনুসরণকে বাধ্য করেছেন। এজন্য নবীজি (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই আমাকে কোরআন ও তার অনুরূপ বিষয় দেওয়া হয়েছে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৬০৪)
৫. নবীদের নেতৃত্ব দান: রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নবী-রাসুলদের নেতৃত্ব দান করা হয়েছিল। আর তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল মিরাজের রাতে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত মিরাজ সংক্রান্ত দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, এরপর আমি নবীদের এক জামাতে নিজেকে উদ্ভাসিত দেখলাম।…নামাজের সময় হলো, আমি তাদের ইমামতি করলাম।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৭২)
৬. বিশেষ পাঁচ অনুগ্রহ: জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমাকে পাঁচটি বিষয় দান করা হয়েছে, যা আমার আগে কোনো নবীকে দান করা হয়নি। তা হলো- আমাকে এমন প্রখর ব্যক্তিত্ব দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে, এক মাস দূরত্বেও যা প্রতিফলিত হয়। আমার জন্য জমিনকে পবিত্র করা হয়েছে এবং নামাজের স্থান বানানো হয়েছে, সুতরাং আমার উম্মতের যেখানেই নামাজের সময় হবে, সেখানেই নামাজ পড়তে পারবে। আমার জন্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হালাল করা হয়েছে, যা আমার আগে কারো জন্য হালাল ছিল না। আমাকে (ব্যাপক) সুপারিশের অধিকার দেওয়া হয়েছে। আগের সব নবীকে তাঁদের স্বজাতি ও গোত্রের জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল, কিন্তু আমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৩৮)
৭. সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী: মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম মহানবী (সা.) জান্নাতে প্রবেশ করবেন, তাঁর আগে কোনো নবী-রাসুলও জান্নাতে প্রবেশ করবেন না। আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কিয়ামত দিবসে আমি জান্নাতের তোরণে এসে দরজা খোলার অনুমতি চাইব। তখন দ্বাররক্ষী বলবেন, আপনি কে? আমি উত্তর দেব, মুহাম্মদ। দ্বাররক্ষী বলবেন, আপনার জন্যই আমি আদষ্টি হয়েছি, আপনার পূর্বে অন্য কারো জন্য দরজা খুলিনি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩৭৪)
হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ (সা.), তাঁর পরিবার, সাহাবি ও উম্মতের প্রতি শান্তি বর্ষণ করুন। আমিন।