প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান চীন সফরের মূল লক্ষ্য হলো দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর করা, চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খাতে কার্যকর সহযোগিতা নিশ্চিত করা। এমনটাই জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদি আমিন।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাষ্ট্রীয় সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
মাহদি আমিন বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর। সফরটি তিনটি পর্বে বিভক্ত। প্রথমে তিনি মালয়েশিয়া সফর করেন। সেখানে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, দেশটির রাজা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে আলোচনা হয়।
এরপর দ্বিতীয় পর্বে প্রধানমন্ত্রী চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নস’ সম্মেলনে অংশ নেন। ওই সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, নীতিনির্ধারক এবং ব্যবসায়িক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের উদ্যোগ, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে বলে জানান তিনি।
বেইজিংয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভ্যর্থনা
মাহদি আমিন বলেন, সফরের তৃতীয় পর্বে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে বেইজিং সফর করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। লালগালিচা সংবর্ধনা, মোটর শোভাযাত্রা, পূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল এবং উচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তাকে রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা দিয়াওইউতাইয়ে নেওয়া হয়।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে সফর করছেন। ২৫ সদস্যের এই প্রতিনিধিদলে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা পদমর্যাদার ১১ জন রয়েছেন।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোই অন্যতম লক্ষ্য
মাহদি আমিন বলেন, চীন সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এ লক্ষ্যেই বেইজিংয়ে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে চীনের প্রায় ৮০টি শীর্ষ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, অর্থনৈতিক সংস্কার, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
তিনি চীনা উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে উৎপাদন ও শিল্প খাতের একটি প্রতিযোগিতামূলক, নির্ভরযোগ্য এবং লাভজনক গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। একই সঙ্গে আনোয়ারা ও মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, চীনে বাংলাদেশের প্রথম ইনভেস্টমেন্ট অফিস স্থাপন এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন বিনিয়োগকারীদের ১৫ দিনের কম সময়ে লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
তিস্তা প্রকল্পসহ পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা
সংবাদ সম্মেলনে মাহদি আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গুয়োয়িংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে।
বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা ঝুঁকি মোকাবিলা, নদী খনন, নদীভাঙন প্রতিরোধ, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং নৌ-নেভিগেশন খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনের কারিগরি সহায়তা কামনা করেন। জবাবে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী ইতিবাচক সাড়া দিয়ে এ খাতে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
তিনি বলেন, ২০০৫ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পানি বিশেষজ্ঞদের পারস্পরিক সফর দুই দেশের সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের চীনে প্রশিক্ষণের আমন্ত্রণও জানান তিনি।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে বৈঠক
মাহদি আমিন বলেন, বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইক্সিংয়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৈঠকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
চীনা পক্ষ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। একইসঙ্গে বিএনপি ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়।
শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈঠক
মাহদি আমিন জানান, চীন সফরকালে বিভিন্ন বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
এ ছাড়া চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
লি কিয়াং ও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
সংবাদ সম্মেলনে মাহদি আমিন জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক গ্রেট হলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, শিক্ষা ও উন্নয়ন সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১৫টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া শুক্রবার সকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে এবং দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে আলোচনা হবে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে এগোচ্ছে সরকার
মাহদি আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সামনে রেখে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছেন। মালয়েশিয়া, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এবং চীন সফরে তিনি যে সম্মান ও মর্যাদা পাচ্ছেন, তা বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি, শিক্ষা, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।