দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক প্রতিরোধ জোরদারে এবার ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রসারিত হচ্ছে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি (দুপ্রক)। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যক্রমে নতুন এ কর্মসূচি যুক্ত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন অর্থবছর থেকে এ কার্যক্রম ইউনিয়ন পর্যায়েও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ফলে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হলে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম আরো বিস্তৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দুদক ও দুর্নীতি বিরোধী সংগঠনের নেতারা মনে করছেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্নীতিবিরোধী কমিটি গঠিত হলে স্থানীয় জনগণের এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ বাড়বে।একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ আরো শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি সততা, নৈতিকতা ও সুশাসনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব।
অতীতে এ ধরনের কমিটির কার্যক্রম পরিচালনার যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করে কমিটি গঠনের পরামর্শ দেন তিনি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘অতীতের দুর্বলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি নতুন কাঠামো তৈরি করা যায়, তাহলে উদ্যোগটি সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।’
দুদকের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ের দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সাত সদস্যবিশিষ্ট হবে। এতে একজন সভাপতি, প্রয়োজনীয় সংখ্যক দায়িত্বশীল সদস্য এবং অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারী সদস্য রাখার বিধান রয়েছে। সমাজের সৎ, সচেতন ও স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে সদস্য মনোনয়ন দেওয়া হবে।
বিদেশি নাগরিক, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, প্রজাতন্ত্রের বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য, আদালতের অপ্রকৃতস্থ ঘোষিত ব্যক্তি, দেউলিয়া, ঋণখেলাপি, ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তি কমিটির সদস্য হওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হয় না বলে দুদকের গঠনতন্ত্রে রয়েছে।
দুদক সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম বলেন, দুর্নীতি দমনে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। তাই ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতিরোধ কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে তৃণমূল জনগণের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টি করাই আমাদের লক্ষ্য। আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে পারলে দুর্নীতি প্রতিরোধ আরো কার্যকর হবে।
দুদকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের সর্বশেষ তথ্যমতে, বর্তমানে জেলা ও মহানগর পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১৩ সদস্য এবং উপজেলা পর্যায়ে সর্বোচ্চ নয় সদস্যের দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি রয়েছে। এসব কমিটির মাধ্যমে আলোচনা সভা, রচনা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা, র্যালি, মানববন্ধন, সেমিনার, নাটক ও বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঁচ শতাধিক দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এসব কমিটির উদ্যোগে এক বছরে দেড় হাজারের বেশি আলোচনা সভা, এক হাজারের বেশি বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং শত শত র্যালি, মানববন্ধন ও অন্যান্য সচেতনতামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি কার্যকর ভূমিকা পালন করলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বলে জানিয়েছেন ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, বিশেষ করে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কৃষি উপকরণ বিতরণসহ স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি সেবায় যে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকে, সেগুলো কমিয়ে আনতে এসব কমিটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।