মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশের আমদানি ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তবে এই চাপ সামাল দিতে করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানোর নীতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনা ২০২৬-২৭: বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক মতবিনিময়সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), চ্যানেল ২৪ ও দৈনিক সমকাল যৌথভাবে এই আয়োজন করে।
মন্ত্রী জানান, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আগে যেসব পণ্য তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যেত, এখন সেগুলোর দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। ফলে সরকারের আমদানি ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদের সঞ্চালনায় আরো বক্তব্য দেন জিইডি সদস্য মনজুর হোসেন, আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ ও রিজওয়ান রাহমান, আইসিএমএবি প্রেসিডেন্ট মো. কাওসার আলম, আইসিএবি প্রেসিডেন্ট এন কে এ মবিন, ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, ইউসিবি চেয়ারম্যান শরীফ জহীর প্রমুখ।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আগে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তিতে প্রতি ইউনিট এলএনজি ১০ ডলারে কেনা হলেও এখন তা স্পট মার্কেট থেকে প্রায় ২০ ডলারে কিনতে হচ্ছে।
একইভাবে অপরিশোধিত তেল আগে ৫০ থেকে ৬০ ডলারে পাওয়া গেলেও এখন তা বেড়ে ১১৬ ডলারে পৌঁছেছে। সারও ৪৫৬ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৮০০ ডলারে কিনতে হচ্ছে।
তিনি জানান, দেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো পর্যাপ্ত জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতার অভাব। যদি অন্তত দুই মাসের এলএনজি মজুদের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে বর্তমানের মতো বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কিনতে হতো না।
জ্বালানি ও অর্থনৈতিক চাপ: বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে জ্বালানি খাতের উচ্চ মূল্য এখন অর্থনীতির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি মন্ত্রণালয় শিল্প-কারখানা সচল রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলেও তিনি জানান।
তিনি বলেন, বাজেট ব্যবস্থাপনায় অতীতে অর্থনৈতিক সক্ষমতা না বাড়িয়ে বরং ব্যয়ের আকার বড় করা হয়েছে, যার ফল এখন চাপ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সরকারের বর্তমান লক্ষ্য হলো আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা।
করনীতি ও রাজস্ব কৌশল: করনীতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, রাজস্ব বাড়াতে ট্যাক্স বেইস বা করের আওতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে ব্যক্তিগত আয়কর বাড়ানো হবে না। বরং নতুন করদাতা যুক্ত করা এবং করব্যবস্থাকে আরো বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এ বিষয়ে কাজ করছে। আগামী বাজেট এবং পরবর্তী অর্থবছরে এর ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। মন্ত্রী আরো বলেন, ‘করদাতাদের ওপর কোনো অতিরিক্ত চাপ তৈরি করা হবে না। সাধারণ মানুষ বা ব্যবসায়ীদের জন্য উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।’
ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব ও অংশগ্রহণ: ডিসিসিআই তাদের প্রস্তাবে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা পাঁচ লাখ টাকা নির্ধারণ এবং সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশ করার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে নন-লিস্টেড কম্পানির করহার লিস্টেড কম্পানির সমপর্যায়ে নামানো এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করপোরেট রিটার্ন ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় আরো চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে এলএনজি ও অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলছে। সরকার কর সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা করলেও বৈশ্বিক অস্থিরতা সামাল দেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ আরো স্থিতিশীল ও সহায়ক করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, আমদানিনির্ভর খাতে অতিরিক্ত ভ্যাট ও জটিল রিফান্ড প্রক্রিয়া ব্যবসার গতি কমিয়ে দিচ্ছে, যা দ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে সহজ করা জরুরি।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, বর্তমান করকাঠামোকে আরো বিনিয়োগবান্ধব করতে হলে নীতিগত সহায়তা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে উৎপাদন খাত, হাই-টেক পার্ক এবং স্থানীয় শিল্পে করছাড় ও প্রণোদনা দিলে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।