রাজধানী ঢাকায় ম্যালেরিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এক সরকারি কর্মকর্তার মৃত্যুর পর বিষয়টি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—ঢাকায় কি এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বাস্তবতায় ঢাকায় স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি অত্যন্ত কম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশীদ জানিয়েছেন, “ঢাকায় ম্যালেরিয়া সংক্রমণের আশঙ্কা কার্যত নেই। কেউ বিদেশ বা ম্যালেরিয়া-প্রবণ এলাকা থেকে আক্রান্ত হয়ে আসতে পারেন, তবে রাজধানীতে বসে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।”
জানা গেছে, সম্প্রতি মারা যাওয়া বাণিজ্য সচিব আফ্রিকার ক্যামেরুন সফর থেকে ফেরার পর জ্বরে আক্রান্ত হন। ক্যামেরুন ম্যালেরিয়া-প্রবণ দেশ এবং সেখানে রোগটির শক্তিশালী ভ্যারিয়েন্ট বিদ্যমান। জ্বরের পাশাপাশি তার প্লাটিলেট কমে গেলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরে ম্যালেরিয়া শনাক্ত হয়।
তবে ঢাকায় অ্যানোফিলিস প্রজাতির মশার উপস্থিতি নিয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, সাম্প্রতিক জরিপে রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর ও গুলশান এলাকায় অন্তত তিনটি প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশা পাওয়া গেছে। ২০২৩-২৪ সাল থেকে বিভিন্ন জরিপে ঢাকাসহ দেশের শহরাঞ্চলে ছয় প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশার অস্তিত্ব মিলেছে বলেও জানান তিনি।
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, অ্যানোফিলিস মশা থাকলেই ম্যালেরিয়া ছড়াবে—এমন নয়। “মশার শরীরে ম্যালেরিয়া পরজীবী থাকতে হবে। সেই জীবাণু আছে কি না এবং কী মাত্রায় আছে, তা পরীক্ষা করা জরুরি,” বলেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায় জানা যায়, ম্যালেরিয়া সাধারণত সংক্রমিত অ্যানোফিলিস স্ত্রী মশার কামড়ে ছড়ায়। কোনো আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানোর পর সেই মশা অন্য কাউকে কামড়ালে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিদেশ থেকে আক্রান্ত কেউ ঢাকায় এলে তাত্ত্বিকভাবে সীমিত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যদিও এ ধরনের ঘটনার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের তিন পার্বত্য জেলা ও সীমান্তবর্তী ১৩টি জেলাকে এখনো ম্যালেরিয়া-প্রবণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ঢাকায় এখন পর্যন্ত ম্যালেরিয়াবাহী মশার উপস্থিতির প্রমাণ মেলেনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “ম্যালেরিয়া উপদ্রুত এলাকায় না গেলে সাধারণত এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। তাই ঢাকায় বসে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ডেঙ্গু, জিকা ইত্যাদি মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে, তাই মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি।
এদিকে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে ২০০৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিত নজরদারি ও গবেষণা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
ম্যালেরিয়ার লক্ষণ কী?
চিকিৎসকদের মতে, ম্যালেরিয়ার প্রধান লক্ষণ হলো কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা, যা ১০৫–১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে জ্বর নির্দিষ্ট বিরতিতে (একদিন পরপর) আসে এবং কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়ে ঘাম দিয়ে কমে যায়।
এ ছাড়া আরও যেসব লক্ষণ দেখা যেতে পারে—
তীব্র কাঁপুনি বা শীত শীত ভাব
মাথাব্যথা
বমি বমি ভাব ও বমি
অতিরিক্ত ঘাম
দুর্বলতা ও ক্লান্তি
ক্ষুধামন্দা ও হজমের সমস্যা
মাংসপেশি বা পেটব্যথা
রক্তশূন্যতা
গুরুতর ক্ষেত্রে খিচুনি
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, এসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত, বিশেষ করে কেউ যদি সম্প্রতি ম্যালেরিয়া-প্রবণ এলাকায় ভ্রমণ করে থাকেন।
সব মিলিয়ে, বিশেষজ্ঞদের মতে ঢাকায় বর্তমানে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি খুবই কম। তবে মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং জমে থাকা পানি অপসারণের মতো পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা জরুরি। [সূত্র: বিবিসি বাংলা]