বর্তমান জ্বালানিসংকটের মূল কারণ গ্যাস সরবরাহের স্বল্পতা। এই ঘাটতি হঠাৎ তৈরি হয়নি। ২০১১-১২ সাল থেকেই পেট্রোবাংলা গ্যাস আমদানিনির্ভর পরিকল্পনা গ্রহণ করে আসছিল। ২০১৬-১৭ সালে নিজস্ব উৎস (পেট্রোবাংলা ও আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি মিলিয়ে) থেকে গ্যাসের উৎপাদন যেখানে ২৭০ কোটি ঘনফুটে পৌঁছেছিল, সেটা এখন কমে প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুটে এসে ঠেকেছে। এটা পেট্রোবাংলার অনেক বড় একটা ব্যর্থতা।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের ব্যাপারটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে উঠেছিল। তাদের পরিকল্পনার অন্যতম অংশ ছিল ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) এবং ল্যান্ড-বেজড রিগ্যাসিফিকেশন প্ল্যান্ট স্থাপন। এখন দেখা যাচ্ছে, এর কোনোটিই প্রত্যাশামাফিক কার্যকর হয়নি। মহেশখালীতে মাত্র দুটি এফএসআরইউ রয়েছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী বাইরের উৎস থেকে গ্যাস আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর জন্য গত ১০-১১ বছরে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
গতফলে এখন যে সংকট দেখা দিয়েছে, তার দায় মূলত আগের সরকারের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ব্যর্থতার ওপর বর্তায়। নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত মোটামুটি ‘বাপেক্স অনলি’ নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিবছরই ১০০-২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন কমছে। এই উৎপাদন হ্রাসের প্রবণতা ঠেকাতে আরও আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
বর্তমান সরকারকে এখন এই ঐতিহাসিক ঘাটতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দ্রুত সমাধান নেই। তবে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেসব গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন ক্রমেই কমছে, সেগুলোর উন্নয়নে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অভিজ্ঞ কোম্পানিকে পরামর্শক হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। শেভরনের দীর্ঘদিনের স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত। এসব উদ্যোগের ফল পেতে ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে।
তাই বর্তমান সংকট সামাল দিতে এখনই বিকল্প জ্বালানির দিকে নজর দিতে হবে। বাসাবাড়িতে এলপিজির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। বিদ্যমান অবকাঠামোর মাধ্যমে প্রায় তিন মিলিয়ন টন পর্যন্ত এলপিজি আমদানির সক্ষমতা রয়েছে। যানবাহনে সিএনজির বিকল্প হিসেবে অটোগ্যাস এবং কিছু শিল্পে এলপিজির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। গ্যাস চুরি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ জরুরি—প্রতিদিন প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চুরি হচ্ছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ সক্ষমতা কাজে লাগানো এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পর গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমবে।
দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির চাহিদা সঠিকভাবে নিরূপণ করে বহুমুখী সংমিশ্রণ (সৌর, কয়লা, গ্যাস, পারমাণবিক) এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার দিকে এগোতে হবে। শুধু একটি পদক্ষেপ দিয়ে সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ছাড়া দৃশ্যমান স্বস্তি পাওয়া যাবে না। আওয়ামী লীগ আমলের আমদানিনির্ভর ও অনুসন্ধান-বৈমুখী নীতির ফল এখন বিএনপি সরকারকে ভোগ করতে হচ্ছে।