বিশ্বজুড়ে সংঘাত, সহিংসতা ও মানবিক সংকটের মধ্যেও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় তাদের অসামান্য অবদানকে স্বীকৃতি জানিয়ে জাতিসংঘ এবারও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করেছে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস। দিবসটি উপলক্ষে বিশ্বব্যাপী দায়িত্ব পালনরত ৫০ হাজারেরও বেশি শান্তিরক্ষীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে, যাদের মধ্যে চার হাজারেরও বেশি সদস্য বাংলাদেশ থেকে প্রেরিত।
প্রতি বছর ২৯ মে পালিত এ দিবসটি শুধু শান্তিরক্ষীদের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতি নয়, বরং বিশ্বশান্তি রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়। এ উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস শান্তিরক্ষীদের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করে তারা বেসামরিক জনগণকে সুরক্ষা দিচ্ছেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করছেন।
মহাসচিব উল্লেখ করেন, শান্তিরক্ষীরা শুধু যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই থেমে থাকেন না; তারা মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, নির্বাচন আয়োজন, রাজনৈতিক সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টি এবং সংঘাতের স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নিজ দেশ ও পরিবার থেকে হাজার মাইল দূরে অবস্থান করে তারা মানবতার কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন।
এ বছরের আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘শান্তিতে বিনিয়োগ’। জাতিসংঘের মতে, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বিনিয়োগ মানে কেবল সংঘাত প্রতিরোধ নয়, বরং একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। এজন্য শান্তিরক্ষীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে দায়িত্ব পালনকালে প্রায় সাড়ে চার হাজার শান্তিরক্ষী প্রাণ হারিয়েছেন। গত বছরই নিহত হয়েছেন ৫৯ জন শান্তিরক্ষী। তাদের আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে গুতেরেস বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে কোনো প্রাণহানিই কাম্য নয়। একই সঙ্গে তিনি শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলাকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারী দেশ হিসেবে স্বীকৃত। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা পেশাদারিত্ব, মানবিকতা ও সাহসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাদের নিষ্ঠা ও দক্ষতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করেছে।
দিবসটি উপলক্ষে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী ৫ জুন নিহত শান্তিরক্ষীদের স্মরণে শান্তিরক্ষী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন মহাসচিব। একইসঙ্গে দায়িত্ব পালনকালে নিহত সদস্যদের মরণোত্তর ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদক প্রদান করা হবে। এছাড়া শান্তিরক্ষা মিশনে বিশেষ অবদানের জন্য ‘ইউএন মিলিটারি জেন্ডার অ্যাডভোকেট অব দ্য ইয়ার’ এবং ‘ইউএন ওম্যান পুলিশ অফিসার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারও প্রদান করা হবে।
বিশ্ব যখন নতুন নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন শান্তিরক্ষীদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাদের আত্মত্যাগ, পেশাদারিত্ব ও মানবিক দায়বদ্ধতা আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর এই অভিযাত্রায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অবদান বিশ্বমঞ্চে দেশের জন্য গর্ব ও মর্যাদার এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।