পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়া যথাযথভাবে সংরক্ষণে সরকার সারাদেশে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে বিনামূল্যে লবণ বিতরণ, চামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা এবং বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ।
চামড়া শিল্পের সংকট মোকাবিলা এবং মানসম্মত কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের লক্ষ্যে গঠিত টাস্কফোর্স এসব উদ্যোগের কথা জানিয়েছে।
টাস্কফোর্স সূত্রে জানা যায়, কোরবানির চামড়া যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য সরকারি অর্থায়নে সারাদেশের মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে বিনামূল্যে লবণ পৌঁছে দেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ ক্রয়ের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
চামড়া সঠিকভাবে ছাড়ানো ও সংরক্ষণের জন্য মাংস শ্রমিক এবং মসজিদের ইমামদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এই প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য হলো কাঁচা চামড়া নষ্ট হওয়া কমানো এবং চামড়ার গুণগত মান নিশ্চিত করা।
গত বছর ৯ হাজার ৩৩০টি মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের জন্য বরাদ্দ ২০ কোটি টাকার আওতায় ১১ হাজার ৫৭১ মেট্রিক টন লবণ ক্রয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তবে জেলা পর্যায়ের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত ৮ হাজার ৯৬ মেট্রিক টন লবণ বিতরণ করা হয়। এর মাধ্যমে প্রায় ১৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২৩টি চামড়া সফলভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছিল।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ প্রায় ৫৭ লাখ, ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখ এবং অন্যান্য পশু প্রায় সাড়ে ৫ হাজার। এ বছর কোরবানির চাহিদা এক কোটির কিছু বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রাথমিক হিসাবে, এ বছর কোরবানির চামড়া সংরক্ষণে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার মেট্রিক টন লবণের প্রয়োজন হতে পারে। গত বছর এই খাতে প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টন লবণ ব্যবহার হয়েছিল।
টাস্কফোর্স জানিয়েছে, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়, পশুর হাট এবং স্থানীয় দোকানগুলোতে পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি সারাদেশের লবণ ডিলার ও মিল মালিকদের তালিকাও সংশ্লিষ্টদের কাছে সরবরাহ করা হবে।
চামড়া সংগ্রহ ও বাজার ব্যবস্থাপনা আরও সুশৃঙ্খল করতে দেশব্যাপী চামড়া আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের একটি খসড়া ডাটাবেজ প্রস্তুত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে তাদের নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এদিকে, কোরবানির মৌসুমে চামড়া কেনা ও সংরক্ষণের জন্য ব্যবসায়ীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ ঋণ সুবিধা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গত ৫ মে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পুনঃতফসিল বা খেলাপি ঋণ থাকা চামড়া ব্যবসায়ীরাও আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত খেলাপি অবস্থায় থেকেই নতুন মূলধনী ঋণ নিতে পারবেন। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে চলতি বছর চামড়া খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের চেয়ে কম হতে পারবে না।
চামড়া শিল্পের উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে ঈদের পরবর্তী তিন মাস বিসিক চামড়া শিল্পনগরী, ঢাকায় নিরবচ্ছিন্ন এবং নির্ধারিত ভোল্টেজে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে পবিস-৩, আরইবি এবং পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সিইটিপিতে ডেডিকেটেড এক্সপ্রেস ফিডার লাইনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ, শিল্পনগরী ও সিইটিপিতে জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রাখা এবং সাভার গ্রিড থেকে বিশেষ লোড বরাদ্দের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কোরবানির মৌসুমে চামড়া সংরক্ষণ, বাজার ব্যবস্থাপনা, লবণ সরবরাহ, অর্থায়ন এবং শিল্পনগরীর বিদ্যুৎ সুবিধা সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করা গেলে চামড়া নষ্ট হওয়া কমবে এবং রপ্তানিমুখী এই শিল্প আরও লাভবান হবে।