মার্কিন-ইরান উত্তেজনা এবং লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের হামলার জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক তেলের মজুত কমে যাওয়ায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ফের ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতি নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে গত বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলারে ওঠে। দিন শেষে তা ১০০ দশমিক ৬৯ ডলারে স্থির হয়, যা মে মাসের পর সর্বোচ্চ। শুক্রবার কিছুটা কমলেও গত সপ্তাহের তুলনায় দাম প্রায় ১২ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারিতে ইরান-সংকট শুরুর সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই দুই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিচালিত হয়। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় লোহিত সাগরের তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলেও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রেড সাগরে হামলার জন্য ইরান ও হুথিদের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। একই সময়ে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি বছরের শেষ প্রান্তিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়াতে পারে। অন্যদিকে জেপি মরগানের বিশ্লেষণ বলছে, সরবরাহে বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে প্রতি অতিরিক্ত মাসে তেলের দাম আরও ৭ থেকে ৮ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলেও সংঘাতের প্রভাবে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে পৌঁছেছিল। তখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) সদস্য দেশগুলো কৌশলগত মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছেড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে বর্তমানে সেই সুযোগ অনেকটাই সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ কমে প্রায় ৩১১ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক মজুত ও ভাসমান গুদামেও তেলের পরিমাণ কমে যাওয়ায় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে।
অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানির বাজারেও চাপ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে রিফাইনিং মার্জিন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ইউরোপে ডিজেল ও জেট ফুয়েলের সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি সীমিত হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপে রয়েছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে কৃষি ও পরিবহন খাতে।
অন্যদিকে, তেলের উচ্চমূল্যের কারণে রাশিয়ার উরাল ক্রুডের রপ্তানি আয় বেড়েছে। ভারত ও চীন রুশ তেল আমদানি অব্যাহত রাখায় পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দেশটির রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দ্রুত নিরসন না হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: আরটি