প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলাম ২৫ জুলাই শনিবার রাজধানীর মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত ‘ফিরে দেখা জুলাই ২০২৪’ অনুষ্ঠানে এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে অস্বীকার বা অবহেলা করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
শামছুল ইসলাম বলেন, জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করেই বর্তমান সরকার রাষ্ট্র ও সমাজ পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নিতে চায়। একাত্তর যেমন স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল, তেমনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সুশাসন ও মানুষকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। এই চেতনার মূল ভিত্তি হলো বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
তিনি জুলাই চেতনাকে তিনটি প্রধান স্তম্ভে ভাগ করেছেন। প্রথম স্তম্ভ—বৈষম্যের অবসান। কোনো নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বঞ্চনার শিকার না হয়। দ্বিতীয় স্তম্ভ—জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা। ক্ষমতা যেন এককেন্দ্রিক না হয় এবং প্রতিষ্ঠানগুলো সংবিধানিক পরিধির মধ্যে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। তৃতীয় স্তম্ভ—জাতীয় সংহতি ও পুনর্মিলন। অতীতের ক্ষত সারিয়ে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া।
প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ওপর নির্যাতন ও গণতন্ত্র হত্যার ধারাবাহিকতায়। তিনি উল্লেখ করেন, সেই সময়ে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারাও ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ২৯ জুলাই প্রেসক্লাবের সামনে এবং ৩০ জুলাই শহীদ মিনারে তাদের একাত্মতা প্রকাশ এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সেনা নিবাসে গণমিছিল ছিল আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট।
সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে শামছুল ইসলাম জানান, গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাদের তিনটি শ্রেণিতে মাসিক সম্মানী ভাতা দেওয়া হচ্ছে। গুরুতর আহতদের থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক ও রাশিয়ায় চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। শহীদ ও আহত যোদ্ধা পরিবারের তথ্যভান্ডার তৈরি করা হয়েছে এবং প্রশিক্ষণ-পুনর্বাসনের কাজ চলছে। বিগত সরকারের আমলে নির্যাতিত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে বোর্ড কমিটি গঠন করা হয়েছে। মেজর সিনহা হত্যা ও বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে তিনি জানান।
সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, বাহিনীকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, পেশাদার, রাজনীতিমুক্ত ও জনমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে। পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনে মেধা ও যোগ্যতাই হবে একমাত্র মানদণ্ড। সশস্ত্র বাহিনীকে কোনো ব্যক্তি বা দলের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। বাহিনীর আনুগত্য থাকবে সংবিধান ও রাষ্ট্রের প্রতি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, জুলাইয়ের আত্মত্যাগ, সত্য ও ইতিহাস যেন অপব্যাখ্যা, বিভ্রান্তি বা সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে বিকৃত না হয়। কেউ কেউ জুলাইকে নিজেদের রাজনৈতিক বয়ানের অংশ হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছেন। ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা মানে সত্যকে ধারণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা।
জাতীয় সংহতির ওপর গুরুত্বারোপ করে শামছুল ইসলাম বলেন, বিভক্ত হলে আধিপত্যবাদী শক্তি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়। বাংলাদেশ কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে মাথা নত করতে চায় না। জুলাইয়ের চেতনা ঐক্যের শিক্ষা দেয়। রাষ্ট্র ও জাতি পুনর্গঠনে ঐক্যের বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শহীদ পরিবার, জুলাই যোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সম্মিলনকে তিনি জাতীয় সংহতির প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা এবং জুলাই যোদ্ধাদের সাহসের সমন্বয়েই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।