ঢাকা, ৩০ অক্টোবর — চার দিনের জাপান সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির একটি ঘোষণা: আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ এক ট্রিলিয়ন ইয়েনে (প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার) পৌঁছাতে পারে, যাতে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান হবে।
২৭ অক্টোবর টোকিওতে দুই প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়। সরকারি পর্যায়ে ব্যবসায়িক পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পরিবেশ এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান বিষয়ে ছয়টি সহযোগিতা দলিল সই হয়। জেট্রোর আয়োজনে বেসরকারি খাতে সই হয়েছে আরও ১৭টি সমঝোতা স্মারক। এ ছাড়া দুটি প্রকল্পে ৪৬.৫৬ বিলিয়ন ইয়েনের (প্রায় ২৯.৫ কোটি ডলার) ঋণ প্রতিশ্রুতি এসেছে।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের জন্য সফরটি ছিল বৃহত্তম দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের সুযোগ। বৈঠকে তাকাইচি বাংলাদেশকে “গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অংশীদার” বলে উল্লেখ করেন।
সহায়তা থেকে বিনিয়োগে
পাঁচ দশক ধরে জাপান মূলত সহজ শর্তের ঋণদাতা। মেট্রোরেল, মাতারবাড়ি, যমুনা রেলসেতু কিংবা শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল—বড় অবকাঠামোর তালিকায় জাপানের ছাপ স্পষ্ট। এবার আলোচনার কেন্দ্রে ছিল বেসরকারি বিনিয়োগ।
এর পেছনে আছে জাপানি কোম্পানিগুলোর ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল। জেট্রোর এক জরিপে ৫৭টি জাপানি প্রতিষ্ঠানের ৭৩.২ শতাংশ ব্যবসা সম্প্রসারণে বাংলাদেশকে শীর্ষ অগ্রাধিকার দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী টোকিওতে মোটরগাড়ি, জ্বালানি, প্রযুক্তি, দ্রুতগতির রেল ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। নাগোয়ায় টয়োটার কারখানাও ঘুরে দেখেন তিনি।
শ্রমবাজারও নতুন সম্ভাবনা। জাপানের জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশের বয়স ৬৫-এর বেশি; ২০৩০ সালে দেশটিতে প্রায় ৬৪ লাখ কর্মীর ঘাটতি হতে পারে। সফরের আগে ১৭ অক্টোবর সই হওয়া দক্ষতা-কর্মসংস্থান স্মারকের আওতায় ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে কর্মী নিয়োগ শুরুর কথা।
বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত হিসাব
দুই দেশ ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিগ-বি উদ্যোগকে ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’তে উন্নীত করেছে। লক্ষ্য, বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সংযোগকেন্দ্র বানানো। উপকূলীয় নিরাপত্তায় জাপান ‘অফিশিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্স’-এর আওতায় একটি টহল জাহাজ দেবে, যার অনুদান সর্বোচ্চ ২.১২ বিলিয়ন ইয়েন।
অঙ্কে ছোট হলেও এর তাৎপর্য বড়: উন্নয়ন অংশীদারিত্ব এখন নিরাপত্তা সহযোগিতার দিকেও গড়াচ্ছে। চীন ও ভারতের মাঝে ভারসাম্য রাখতে জাপান ঢাকার জন্য রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ এক তৃতীয় ভরসা। তবে মার্কিন মিত্র জাপানের নিরাপত্তা-কাঠামোর কতটা কাছাকাছি যাওয়া হবে, সে সিদ্ধান্তে বেইজিং ও নয়াদিল্লির প্রতিক্রিয়াও মাথায় রাখতে হবে।
আসল পরীক্ষা বাস্তবায়নে
তবে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন প্রতিশ্রুতি নয়, প্রক্ষেপণ। বিনিয়োগ আসবে কোম্পানিগুলোর নিজস্ব হিসাবে—নীতির স্থিতিশীলতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, দ্রুত অনুমোদন আর রাজনৈতিক স্থিতির ওপর তা নির্ভর করবে। অতীত অভিজ্ঞতাও সতর্ক করে: ২০১৪ সালের ব্লু ইকোনমি সহযোগিতার ঘোষণা এক দশকেও তেমন এগোয়নি, ২০১৯ সালের শ্রম চুক্তির পরও জাপানে কর্মী পাঠানো প্রত্যাশামতো বাড়েনি।
জাপানি ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলের আসন্ন সফরই হবে প্রথম বাস্তব পরীক্ষা। ঘোষণাকে বিনিয়োগে রূপ দেওয়ার দায় এখন ঢাকার।