‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকার প্রথম পাতায় “দিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলন; দুই দেশের বিবৃতিতে রহস্যময় ফারাক” শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানালো বিজিবি, কিন্তু প্রকাশ করেনি ”আমার দেশ”। পাঠকের সুবিধার্থে বিজিবির প্রতিবাদলিপিটি হুবহু তুলে ধরা হলো।
‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকার ১৪ জুন ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত “দুই দেশের বিবৃতিতে রহস্যময় ফারাক” শীর্ষক প্রতিবেদনে ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে, যা অনুমাননির্ভর এবং প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অসম্পূর্ণ ধারণার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। জনস্বার্থে এবং সঠিক তথ্য উপস্থাপনের লক্ষ্যে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
প্রথমত,
মনে রাখা প্রয়োজন, যৌথ বিবৃতি সম্মেলনের একটি সারসংক্ষেপ। অপর পক্ষে বিজিবি কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তের বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে যা, জয়েন্ট রেকর্ড অফ ডিসকাশসনের (জেআরডি) ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনের অন্যতম কেন্দ্রীয় দাবি হলো যৌথ প্রেস বিবৃতিতে “সীমান্ত হত্যা” শব্দের পরিবর্তে “সীমান্তে সংঘটিত মৃত্যু” শব্দবন্ধ ব্যবহার বিজিবির অবস্থানের দুর্বলতা প্রমাণ করে। এই দাবি তথ্যগতভাবে ভুল। মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক দলিল – জয়েন্ট রেকর্ড অব ডিসকাশনস (জেআরডি) – এ “কিলিং” শব্দটিই ব্যবহৃত হয়েছে এবং বিজিবি কখনো এই অবস্থান থেকে সরে আসেনি। এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে যথাযথভাবে বিবেচিত হয়নি। কোনো সম্মেলনের প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণে মূল আলোচনার আনুষ্ঠানিক নথিই প্রামাণিক দলিল-সংক্ষিপ্ত প্রেস বিবৃতি নয়।
দ্বিতীয়ত,
প্রতিবেদনে এমন ধারণা সৃষ্টি করা হয়েছে যে যৌথ প্রেস বিবৃতিতে পুশ-ইন, সীমান্ত হত্যা বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুপস্থিত থাকায় সেগুলো বৈঠকে গুরুত্ব পায়নি। বিষয়টি ঠিক নয়। বিজিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুশ-ইন, সীমান্ত হত্যা, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে অবৈধ অবকাঠামো নির্মাণ, মাদক চোরাচালান, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রমসহ বাংলাদেশের সকল উদ্বেগ বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। অর্থাৎ বিষয়গুলো শুধু আলোচিতই হয়নি, আনুষ্ঠানিকভাবে জয়েন্ট রেকর্ড অব ডিসকাশনে (জেআরডি) নথিবদ্ধও হয়েছে।
তৃতীয়ত,
প্রতিবেদনে যৌথ প্রেস বিবৃতি ও বিজিবির পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মধ্যে পার্থক্যকে “রহস্যময়” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সাধারণত আয়োজক দেশ বা সংস্থা একটি সংক্ষিপ্ত যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে এবং অংশগ্রহণকারী দেশ নিজস্ব অগ্রাধিকার ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আলাদা সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে। এই স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকে আমার দেশের প্রতিবেদনে উদ্দেশ্যমূলকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
চতুর্থত,
প্রতিবেদনে বিভিন্ন সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে যে, বিজিবি প্রতিনিধিদল বিএসএফের কাছে “এক ধরনের আত্মসমর্পণ” করেছে, “আপোসকামী অবস্থান” নিয়েছে কিংবা “ভারতের প্রতি দুর্বলতা” প্রদর্শন করেছে। কিন্তু এত গুরুতর অভিযোগের পক্ষে একটিও যাচাইযোগ্য প্রমাণ বা নথিপত্র উপস্থাপন করা হয়নি। বিএসএফের সাম্প্রতিক পুশ-ইন ইস্যুতে মাঠপর্যায়ে বিজিবি যে অনমনীয় দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে, তার ধারাবাহিকতাই দিল্লির শীর্ষ সম্মেলনে প্রতিফলিত হয়েছে-বিজিবির দৃঢ় অবস্থান এটিই স্পষ্ট করে। সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি অনুযায়ী, এত গুরুতর অভিযোগে অনুমান বা অজ্ঞাত সূত্রের বক্তব্য কখনো প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।
পঞ্চমত,
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের “পজিশন পেপার” প্রতিনিধিদলের দিল্লি যাত্রার আগেই বিএসএফের হাতে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক ও সংবেদনশীল ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে দুটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। প্রথমত, “পজিশন পেপার” এই সম্মেলনের কোনো আনুষ্ঠানিক পরিভাষা নয়, শব্দটি বিষয়টিকে নাটকীয় ও অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকের আগে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচ্য বিষয়, এজেন্ডা পয়েন্ট এবং প্রাসঙ্গিক নথি বিনিময় একটি প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া। উল্লেখ্য, বিএসএফ কর্তৃপক্ষ ১৪ মে ২০২৬ তারিখে তাদের এজেন্ডা পয়েন্টসমূহ বিজিবি সদর দপ্তরকে প্রেরণ করে যা ১৬ মে ২০২৬ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়। এই স্বাভাবিক আনুষ্ঠানিক বিনিময়কে “গোপন তথ্য ফাঁস” বা “নিরাপত্তা ব্যত্যয়” হিসেবে উপস্থাপন করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান হয়।
ষষ্ঠত,
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিজিবি মহাপরিচালকের সাক্ষাৎকে প্রতিবেদনে “গোপন বৈঠক” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রনোদিত। পূর্বে আয়োজিত প্রতিটি সম্মেলনেই আয়োজক দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী/উপদেষ্টার সঙ্গে অতিথি বাহিনীর প্রধানের সৌজন্য সাক্ষাৎ একটি অনুসৃত রীতি। ঢাকায় অনুষ্ঠিত ৫৬তম সীমান্ত সম্মেলনে ডিজি বিএসএফ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাননীয় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে একই ধরনের সাক্ষাৎ করেছিলেন। এবারও মহাপরিচালকের সাথে বিজিবির অন্য শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তা ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সাথে সাক্ষাৎ করেন যা ভারতে গমনের পূর্বেই পূর্বনির্ধারিত এবং অনুমোদিত ছিল যেখানে সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান মহাপরিচালক বিজিবি দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করেন। ‘আমার দেশ’ এর প্রতিবেদনে নাটকীয়ভাবে যে চিঠির কথা বলা হয়েছে তার প্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে যে, উক্ত বৈঠকে কোন চিঠিই হস্তান্তর করা হয়নি। উল্লেখ্য যে, বিজিবি মহাপরিচালকের সাথে বিজিবি সদর দপ্তরের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাও উক্ত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা সংক্রান্ত সফরে আয়োজক দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ একটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক রীতি -এটিকে রহস্যময় করে উপস্থাপন করা বাস্তবতা বিবর্জিত।
সপ্তমত,
প্রতিবেদনে বিজিবি মহাপরিচালকের ভারতে পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণের তথ্য উল্লেখ করে তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এটি কেবল অযৌক্তিকই নয়, বিপজ্জনকও। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ফ্রান্স, পাকিস্তান ও চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত পেশাগত প্রশিক্ষণ ও কোর্সে অংশগ্রহণ করেন। এই যুক্তির ধারাবাহিকতায় কি তাঁরা প্রত্যেকেই সেই সব দেশের প্রতি আজীবন অনুগত বলে সন্দেহভাজন হবেন? স্টাফ কলেজ/এনডিসি সহ বিভিন্ন কোর্সে যেসকল ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তারা বাংলাদেশে আসেন, তারাও কী আজীবন বাংলাদেশি স্বার্থ রক্ষা করেন? এমন ধারণা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি পেশাদার সামরিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার প্রকৃতি সম্পর্কেও গভীর অজ্ঞতার পরিচায়ক। একজন কর্মকর্তার মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁর দায়িত্ব পালন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকার ভিত্তিতে – প্রশিক্ষণের দেশের ভিত্তিতে নয়। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর অসংখ্য অফিসার ভারতে পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং করছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে জনগনকে সাথে নিয়ে সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন, কাঁটাতার স্থাপন, মাদক ও মানবপাচার প্রতিহত করা, দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের অস্থিতিশীলতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিজিবি মহাপরিচালকের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনায় দৃঢ় অবস্থান নিয়ে বিজিবি যখন জনমনে আস্থা ফিরিয়ে এনেছে, তখন বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে প্রমাণহীন ব্যক্তিগত আক্রমণের মাধ্যমে হেয় করার প্রচেষ্টা বাহিনীর মনোবল ভাঙার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।
বিজিবি বিশ্বাস করে, সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, মাদক চোরাচালান এবং সীমান্ত নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা জাতীয় স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মতামত ও বিশ্লেষণের অবকাশ অবশ্যই আছে – তবে তা যাচাইকৃত তথ্য, প্রামাণিক নথি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্যের ভিত্তিতে হতে হবে। অনুমান নির্ভর, কল্পনাপ্রসূত ও অজ্ঞাত সূত্রের বরাতে বিজিবির মতো ঐতিহ্যবাহী বাহিনীর ভাবমূর্তি এবং বাহিনীর কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার নীতি ও আদর্শের পরিপন্থি।
‘বিজিবি আশা করে, বিষয়টির এই স্পষ্টীকরণ পাঠকদের সামনে প্রকাশ করে সঠিক তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আপনারা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন।