আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ বা উন্মাদ তত্ত্ব দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। এর মূল বক্তব্য হলো, কোনো নেতা যদি নিজেকে অপ্রত্যাশিত ও চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন, তাহলে প্রতিপক্ষ ভয়ে ছাড় দিতে বাধ্য হবে। রিচার্ড নিক্সনের ভিয়েতনাম যুদ্ধকালীন কৌশল থেকে শুরু করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ পর্যন্ত এই ধারণা দেখা যায়। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভয় সৃষ্টি করতে হলে তা অবশ্যই *বিশ্বাসযোগ্য* হতে হয়। বারবার চরম হুমকি দিয়ে শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন না করলে প্রতিপক্ষ তা ‘ব্লাফ’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং কৌশলের কার্যকারিতা হ্রাস পায়। এতে ‘credibility problem’ তৈরি হয় এবং মিত্রদের মধ্যেও অনাস্থা দেখা দেয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর প্রতিফলন অত্যন্ত স্পষ্ট। শেখ হাসিনার ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শাসনামলে প্রশাসনিক দাপট, বিরোধী দলের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন, গুম, গ্রেপ্তার, আইনি হয়রানি এবং নির্বাচনী কারচুপির মাধ্যমে ভয়ের আবহ তৈরি করা হয়েছিল। এতে স্বল্পমেয়াদে ক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব হলেও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। জনরোষের মুখে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে নির্বাসনে যেতে হয়। ভয় থেকে জন্ম নেওয়া আনুগত্য যে কতটা ক্ষণস্থায়ী, ইতিহাস তার প্রমাণ দিয়েছে।
বর্তমানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির অত্যন্ত সুন্দর, সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল ভোটে ক্ষমতায় এসেছে। এটি প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন বলে বিবেচিত হয়েছে। মানুষ অবশেষে গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছে — যে গণতন্ত্রের জন্য দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন কারাবন্দি ও সংগ্রাম করে গেছেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই সরকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কিন্তু এখনো বিরোধী পক্ষ যেমন জামায়াত, এনসিপি ও পলাতক আওয়ামী লীগও ভয় দেখানোর রাজনীতি অব্যাহত রেখেছে। তারা বারবার ‘আবার বিপ্লব হবে’, ‘নতুন করে অভ্যুত্থান আসবে’ বলে হুমকি দিয়ে জনমনে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এ ধরনের কৌশল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে এবং স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। রাজনৈতিক ইতিহাস প্রমাণ করে, ভয় ও দমনের রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। সংকটের মুহূর্তে এমন নেতৃত্ব দ্রুত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এ থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। হটকারি, অনিশ্চয়তা ও ভয়ের রাজনীতি স্থিতিশীলতা আনে না। বরং বিশ্বাসযোগ্যতা, গণতান্ত্রিক সহনশীলতা, প্রতিষ্ঠানের সম্মান, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বহুমাত্রিক কূটনীতিই টেকসই সাফল্যের চাবিকাঠি। বর্তমান সরকারের সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই যাত্রায় সকল পক্ষের উচিত ভয়ের রাজনীতি পরিত্যাগ করে জনগণের আস্থা অর্জন ও দেশের উন্নয়নে মনোনিবেশ করা। শুধুমাত্র তাহলেই একটি সুস্থ, শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে উঠতে পারবে।