চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করতে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ শুরু হয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) সকালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে লালদিয়া প্রকল্প এলাকায় টার্মিনালটির গ্রাউন্ড ব্রেকিং বা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা সম্প্রসারণে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাই ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক বাণিজ্যের চাহিদা পূরণে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি।
মন্ত্রী বলেন, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সম্পূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগ হচ্ছে। ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করবে।
তিনি বলেন, সম্পূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন।
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালে আধুনিক কনটেইনার ইয়ার্ড, জেটি, গেট ও কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। সেখানে সর্বাধুনিক শিপ-টু-শোর (এসটিএস) ক্রেন এবং বৈদ্যুতিক রাবার টাইয়ার্ড গ্যান্ট্রি (আরটিজি) ক্রেনসহ আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হবে।
টার্মিনালটির বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা হবে প্রায় ৮ লাখ টিইইউস। প্রায় ৬১৬ মিটার দীর্ঘ জেটি নির্মাণের মাধ্যমে বড় আকারের জাহাজও হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রী বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টার্মিনালটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বন্দর ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর ফলে পণ্য পরিবহন ও খালাসে সময় এবং ব্যয় কমবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষিণ প্রান্তে কর্ণফুলী নদীর তীরে পতেঙ্গার লালদিয়া চরে টার্মিনালটি নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, কর্ণফুলী টানেল ও মেরিন ড্রাইভ সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় দেশের প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সহজ যোগাযোগ নিশ্চিত হবে।
টার্মিনালটি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে বড় জাহাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক শিপিং রুটে বাংলাদেশের সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
এর ফলে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং রপ্তানি পণ্য পরিবহন আরও সহজ ও দ্রুত হবে। পাশাপাশি দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সময় ও লজিস্টিকস ব্যয় কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ থাকায় দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথ ও সমুদ্রবন্দরভিত্তিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয়ও আরও কার্যকর হবে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াবে না, বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং লজিস্টিকস হাব হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিতে ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক সরকারের সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর প্রকল্পটির বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। পরে এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়।
অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী নেতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।