প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬’ গুমের শিকার ব্যক্তিদের সরাসরি আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার ও প্রতিকার পাওয়ার পথ সুগম করেছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার পরিবর্তে গুমের শিকার ব্যক্তিদের সরাসরি আদালতে গিয়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত আইনে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত প্যানেল আলোচনা ও বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মানবাধিকার সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ২৭ আগস্ট আইনটি সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। এতে গুমের ধরন ও অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন থেকে ক্ষেত্রবিশেষে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকলে পাঁচ বছর পর আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে তাঁর ওয়ারিশরা সম্পত্তির অধিকার পাবেন। পাশাপাশি দায়ী পক্ষ ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে। আইনটি বর্তমানে সংসদীয় কমিটিতে রয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এতে ভালো কোনো পরামর্শ থাকলে তা অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
বাগেরহাটের মোংলায় মিরাজ শেখের কথিত গুমের প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানের কারণে জলদস্যু ও বনদস্যুরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় দস্যুদের নিজেদের মধ্যে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নিরপেক্ষ তদন্তে কোনো সরকারি বাহিনীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনে যেকোনো নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনে প্রস্তুত রয়েছে।
বর্তমান সরকারের গত ছয় মাসের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, এ সময়ে কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা গুমের ঘটনা ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও পেশাদার হিসেবে গড়ে তুলতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাহিনীর মনোবল বাড়ানোর পাশাপাশি ‘পুরস্কার ও শাস্তি’ নীতিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে নিজের গুম হওয়ার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, তাঁকে অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে একটি ছোট প্রকোষ্ঠে দীর্ঘদিন বন্দি রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছিল। পরে চোখ বেঁধে তাঁকে ভারতের শিলংয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘনের মামলায় সাড়ে নয় বছর আইনি লড়াই করতে হয়। পরে ভারতীয় আদালত তাঁকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষ ও ছাত্রদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। আরও বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী, সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন, আলোকচিত্রী শহীদুল আলম ও নেত্র নিউজের নির্বাহী সম্পাদক নাজমুল আহসান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
এর আগে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারিতে গুম ও নির্যাতনের ওপর আয়োজিত সাত দিনব্যাপী বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রদর্শনীটি ২৯ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে।