একমাসেরও কম সময়ের মধ্যে নিজের দলের প্রতিমন্ত্রী এবং এমপির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, নতুনধারার রাজনীতি চালু করার যে অঙ্গীকার তিনি করেছিলেন তা কেবল কথার কথা নয়, বাস্তবতা। এই দুই ঘটনা শুধু বিএনপির নেতা, কর্মীদের জন্য নয়, সকলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। তারেক রহমান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই ঐতিহাসিক উক্তির বাস্তব রূপ দেখালেন- ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ। দেশের জন্য, দেশের মানুষের স্বার্থে তিনি যে দলের ভেতরেও শুদ্ধি অভিযানে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তা তিনি আবারও প্রমাণ করলেন।বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি একটি বিরল দৃষ্টান্ত।
ইশরাক হোসেন, বিএনপির সম্ভাবনাময় তরুণ নেতা। প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার সন্তান, ইশরাক এলাকায় পিতার মতোই জনপ্রিয়।
দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ইশরাকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তার সাহসী ভূমিকা এবং রাজপথের লড়াই কর্মীদের জন্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। এরকম একজন তরুণ যেকোনো দলের জন্য সম্পদ। কিন্তু তারেক রহমান জানিয়ে দিলেন, যত বড় এবং জনপ্রিয় নেতাই হোন না কেন, তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন। তারেক রহমান জানিয়ে দিলেন, সবার আগে বাংলাদেশ। প্রথমে নারী সংসদ সদস্য মিষ্টিকে সংসদ সদস্য পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং সোমবার ইশরাক হোসেনকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ১ অক্টোবর সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন ফেরদৌসী আহমেদ। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, নারী সংসদ সদস্য যেহেতু সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নয় তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রধানমন্ত্রীর জন্য সহজ ছিল। ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ মোটেও সহজ ছিল না। নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সাহসী। তারেক রহমান ছাড়া অন্য কেউ এতো কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। অতীতে আমরা দেখেছি, এরচেয়ে গুরুতর অপরাধেও মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কিন্তু তারেক রহমান গতানুগতিক ধারায় সরকার পরিচালনা করছেন না। তিনি সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এজন্যই তিনি অনন্য, অসাধারণ। সে কারণেই তিনি এরকম কঠিন সিদ্ধান্ত সহজেই নিতে পেরেছেন।
ইশরাক যে কাজটি করেছেন, তার পদ্ধতিগত ত্রুটি রয়েছে। কিন্তু সে সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি চেষ্টা করেছেন সেটা এখন জাতীয় সমস্যা। মাদক এখন আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মাদকের থাবায় ধ্বংস হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। মাদকবিরোধী অভিযানে সফল না হলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই ইশরাক হোসেনের মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে তিনি যেভাবে মাদক নির্মূল করতে চেয়েছেন সেটা সঠিক নয়। রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়েছেন সদ্যবিদায়ী মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তার সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীরাও কয়েকজনকে ধরতে তৎপর হন। গত শনিবার বিকেলে গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন–সংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুমটিঘর রেলগেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে তিনি আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে কয়েকজনকে ধরতে বলছেন। তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা কয়েকজনকে ধরতে এগিয়ে যান। এ সময় একজনকে গুলি করার হুমকি দিতে শোনা যায়। এক তরুণকে লাথি দিতেও দেখা যায় একজন দেহরক্ষীকে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা সরকারের নির্বাহী বিভাগের অংশ। তাদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা সংবিধান, সরকারের কার্যবিধি এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধান দিয়ে নির্ধারিত হয়।
সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদে সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ এবং সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার বিধান রয়েছে। আর সরকারের কার্যবিধিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে।
তবে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হওয়ার কারণে কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুলিশের মতো তল্লাশি, আটক কিংবা গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা পান না। এ ধরনের ক্ষমতার জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি প্রয়োজন।
বিশেষ করে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এ ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কথা উল্লেখ রয়েছে। আইনটির ২১ ধারায় প্রকাশ্য স্থান বা চলাচলকারী যানবাহনে মাদকদ্রব্য জব্দ এবং নির্দিষ্ট শর্তে কাউকে আটক ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ২৩ ধারায় নির্দিষ্ট শর্তে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পুলিশের উপপরিদর্শক বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা এবং নির্দিষ্ট অন্যান্য বাহিনীর কর্মকর্তাদের।
এই বিধানে মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রী বা সংসদ সদস্য হিসেবে আলাদা কোনো অভিযান পরিচালনার ক্ষমতার উল্লেখ নেই। ফলে তাদের পদমর্যাদা নিজে থেকে মাদকবিরোধী অভিযানের আইনগত এখতিয়ার তৈরি করে না। আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়া এবং সেই অস্ত্র যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রদর্শন বা ব্যবহার করার অনুমতি পাওয়া এক বিষয় নয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ১৩ জুলাই প্রকাশিত ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০২৫’–এর ২৫ অনুচ্ছেদে অস্ত্র বহন ও ব্যবহারের শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। এর ২৫(ক) উপ–অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি স্বীয় লাইসেন্সে অন্তর্ভুক্ত অস্ত্র আত্মরক্ষার নিমিত্ত নিজে বহন/ব্যবহার করতে পারবেন। তবে অন্যের ভীতি/বিরক্তি উদ্রেক করতে পারে এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।’
একই নীতিমালার ২৫(খ) উপ–অনুচ্ছেদে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অন্য প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তারক্ষীদের ইউনিফর্ম ছাড়া প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে সাধারণ লাইসেন্সধারীর ক্ষেত্রে ২৫(ক) উপ–অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অন্যের ভীতি বা বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।
অর্থাৎ আত্মরক্ষার জন্য বৈধ অস্ত্র সঙ্গে রাখা এবং সেই অস্ত্র উঁচিয়ে অন্যকে ভয় দেখানো বা কাউকে ধরতে এগিয়ে যাওয়া আলাদা বিষয়। অস্ত্রের লাইসেন্স থাকলেই সেটি দিয়ে পুলিশি অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা তৈরি হয় না।
বয়সে তরুণ হবার কারণে ইশরাক হোসেন এই কাজটি করেছেন। এটি নিয়ে অনেকেই রাজনীতি পানি ঘোলা করার চেষ্টা করতে শুরু করেছিলেন। অনেকই আবার, এই ঘটনাকে অন্য খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেই সুযোগ দেননি।
বাংলাদেশে অতীতে বহু মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে এরকম কিংবা এরচেয়েও গুরুতর অভিযোগ এসেছে। কিন্তু যারাই ক্ষমতায় ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি। এর পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত ছিলো। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অস্বীকৃতির সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। নিজের দলের লোকদের খারাপ বললে জনগণের কাছে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়- এধরনের একটি মিথ্যা বিশ্বাস রাজনীতিতে প্রচলিত আছে। তাই নিজের দলের লোক অন্যায় করলেও তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা ক্ষমতাসীন দলের সর্বনাশ করেছে সবসময়। ক্ষমতাসীনরা অস্বীকার করলেও সাধারণ মানুষ তাদের অপকর্মের কথা জানতো, ফলে ক্ষতি হতো রাজনৈতিক দলেরই। জনগণের মধ্যে ধারণা তৈরি হতো যে ক্ষমতায় গেলে আইন লঙ্ঘন করা যায়।দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং চাঁদাবাজি করা যায়। এসবের বিচার হয় না। এর ফলে শুধু যে ক্ষমতাসীন দলের ক্ষতি হয় তা নয়, সামগ্রিকভাবে রাজনীতির ওপর মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হয়।
কিন্তু অতীতে কোন দলের নেতাই সাহসের সাথে নিজের দলে শুদ্ধি অভিযান করতে পারেননি, ফলে রাজনীতি সম্পর্কে মানুষের নেতিবাচক মনোভাবেরও পরিবর্তন হয়নি। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এই পরিবর্তনের ধারায় বাংলাদেশের রাজনীতি পরিচ্ছন্ন হবে। আইন অমান্য করলে শাস্তি পেতেই হবে-এই বার্তাটি তারেক রহমান প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। একমাধ্যমে তিনি যেমন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তার আন্তরিকতা প্রমাণ করলেন তেমনি নতুনধারার রাজনীতির পথে দেশকে আরও একধাপ এগিয়ে নিলেন। এই ধারাই বাংলাদেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক ধারা চালু করার ক্ষেত্রে তারেক রহমান হলেন পথপ্রদর্শক।