বরিশালের নদীগুলো যেন ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে জেলার মানচিত্র। নদীর ভাঙনে একের পর এক বিলীন হচ্ছে জনপদ, বসতঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক ও ফসলি জমি। কোথাও ঘর সরিয়ে নেওয়ার আগেই তলিয়ে যাচ্ছে ভিটেমাটি, আবার কোথাও বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা চলে এসেছে ভাঙনের একেবারে কিনারে। বর্ষা মৌসুমে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ায় নদীতীরের মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৩৮টি নদ-নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭১৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ, সন্ধ্যা ও সুগন্ধাসহ আটটি নদীর প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকায় বর্তমানে ভাঙন চলছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেশি।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতীরবর্তী মেহেন্দিগঞ্জে। সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলার চরগোপালপুর ও আলিমাবাদ ইউনিয়নে মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে ৪১টি বসতঘর এবং বাজারের প্রায় ৩০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। চর মিঠুয়া, দড়িরচর খাজুরিয়া, আদর্শ নগর, আন্দারমানিক, জাহাঙ্গালিয়া ও দক্ষিণ উলানিয়াসহ কয়েকটি এলাকাতেও ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
বাবুগঞ্জেও সন্ধ্যা, সুগন্ধা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে বিপর্যস্ত জনজীবন। সড়ক, বেড়িবাঁধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, কবরস্থান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দুই শতাধিক বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। মীরগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় ভাঙনে একাধিক গ্রাম হুমকির মুখে পড়েছে। কোথাও কোথাও মানুষ বসতঘর সরিয়ে নিচ্ছেন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভাঙন অব্যাহত থাকলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীতে বিলীন হতে পারে।
বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া, চরমোনাই ও শায়েস্তাবাদসহ বিভিন্ন এলাকাতেও নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। গত দেড় দশকে চরবাড়িয়া ইউনিয়নের লামচরী গ্রামের কয়েক শ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। এর মধ্যে কিছু পরিবার তিন থেকে চারবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে।
লামচরী গ্রামের বাসিন্দা রফিক মাঝী বলেন, নদী সবকিছু নিয়ে গেছে। এখন আর কোনো জমি নেই। বাধ্য হয়ে অন্যের জমিতে ভাড়া থাকি।
অপর বাসিন্দা জব্বার প্যাদা বলেন, জীবনের সব সহায়-সম্বল নদী নিয়ে গেছে। চোখের সামনে নিজের বাড়ি তলিয়ে যেতে দেখলাম।
নদীভাঙন ঠেকাতে বিভিন্ন এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। নদীর স্রোত ও ভাঙনের তীব্রতায় একপর্যায়ে জিও ব্যাগও নদীতে চলে যাচ্ছে।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাবেদ ইকবাল বলেন, ‘বর্ষাকাল হওয়ায় জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর প্রায় ৬০ কিলোমিটারজুড়ে ভাঙন চলছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেশি। এসব এলাকায় আমাদের জরুরি আপৎকালীন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জিও ডাম্পিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।’